উম্মাহর নক্ষত্ররাজি : ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা)

By | Sun 13 Rajab 1441AH || 8-Mar-2020AD
(১)
নাহ মক্কায় আর থাকা সম্ভব না। ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল পালিয়ে যাচ্ছেন। ঘর দুয়ার স্ত্রী ছেড়ে। লজ্জিত অবস্থায় মাথা নিচু করে পালাচ্ছেন । মুসলমানরা মক্কা বিজয় করে ফেলেছে। অল্প আগে তিনি মুসলমানদের মক্কা বিজয় রুখতে স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে শেষ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদের (রা) ছোট্ট সৈন্য বাহিনীর আক্রমণে সেই প্রতিরোধ ভেস্তে গেছে। ইকরিমার বাহিনীর অনেকেই মারা পরেছে। কোন মতে জীবন নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছেন ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল।
যদিও মক্কার কুরাইশরা নবী মুহাম্মাদ (সা) কে আগেই একরকম কথা দিয়েছিলো যে তারা মক্কা বিজয়ে কোন প্রতিরোধ গড়বে না কিন্তু ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল কুরাইশদের কথার দাম রাখে নি । সে একটা শেষ সুযোগ নিয়েছে মুসলমানদের আটকে দেয়ার । কুরাইশদের হয়ে শেষ প্রতিরোধ গড়েছে সে। কারণ তাঁর গায়ে যার রক্ত বইছে , সেই মানুষটিকে বদরের যুদ্ধে হত্যা করে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিলো মুসলমান বাহিনী। হ্যাঁ ইকরিমার গায়ে যার রক্ত বইছে তিনি হলো কুরাইশ নেতা আমর ইবনে হিসাম । যাকে কুরাইশরা এক সময় আবুল হাকাম (বুদ্ধির বাবা অথবা বুদ্ধিমান ) বলে ডাকতো। এখন ডাকে আবু জাহেল বলে। মুসলমানদের সব থেকে বড় শত্রু ছিলো ইকরিমার বাবা আবু জাহেল। নিজের বাবার নেতৃত্বেই ইকরিমা মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে শত্রুতায় আত্মনিয়োগ করেছিলো তখন। মুসলমানদের ব্যপারে ইকরিমা তাঁর বাবার মতোই ছিলো ভীষণ কঠোর। তাঁর অত্যাচারে ততকালিম মুসলিমদের জীবন হয়ে গিয়েছিলো দুর্বিসহ। মুসলমানদের প্রতি ইকরিমার এই নিষ্ঠুরতা , তাঁর পিতা আবু জাহেলকে বেশ আত্মতৃপ্তি দিতো।
বদরের যুদ্ধেও ইকরিমা তাঁর বাবা আবু জাহেলের সাথে মুসলমানদের বিপক্ষে অংশ গ্রহণ করেছিলো। তিনি ছিলেন আবু জাহেলের ডান হাত। তারা তাঁদের বাহিনী নিয়ে বদরের প্রান্তরে তিন দিন অবস্থান করেছিলো। সেই সময় তাঁরা মদ পান করেছে, উট জবাই করে খাওয়া দাওয়া করেছে, গায়ক – গায়িকাদের নিয়ে নাচে মত্ত হয়েছে। হয়তো ভেবেছিলো অল্প কিছু মুসলমানকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দেবে তাঁরা।আবু জাহেল তো তাঁদের দেবতা লাত ও উজ্জার নামে শপথ করেছিলো যে , মুসলমানদের শেষ না করে সে মক্কায় ফিরবে না। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন। সেই বদরের ময়দানেই লাঞ্ছিত হয়ে পরাজয় বরন করতে হয় কাফির কুরাইশদের।মুসলমান বাহিনীর দুই যুবক আবু জাহেলকে হত্যা করে। আবু জাহেল মুখ থুবরে পরে বদরের ময়দানে। ইকরিমা সেই দিন নিজের চোখেই দেখেছিল তাঁর পিতাকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ইকরিমা সেই দিন বাবার লাশটাকেও মক্কায় নিয়ে আসতে পারে নি । পালিয়ে আসতে হয়েছে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে। কাফির কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় ইকরিমাকে তাঁর বাবার লাশটাও দাফন করার সুযোগ দেয় নি । মুসলমানরা তাঁর বাবার লাশ আরও সব কাফিরের লাশের সাথে কালীব নামক কূপে ফেলে মাটি চাপা দিয়েছে। আর তখন থেকেই প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে ইকরিমার মনে। এবং তিনি হয়ে গেছেন মুসলমানদের অন্যতম শত্রু।
উহুদের যুদ্ধে ইকরিমা ছিলো কুরাইশদের পক্ষ থেকে অগ্রগামী। ইকরিমার স্ত্রীও উহুদের যুদ্ধে তাঁর সঙ্গি হয়েছিলো। বদরের যুদ্ধে যেই নারীরা , ভাই হারিয়েছে , সন্তান কিংবা স্বামী হারিয়েছে। সেই সব নারীদেরকে সাথে নিয়ে ইকরিমার স্ত্রী উম্ম হাকিম চলে এসেছিলেন উহুদের ময়দানে। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো বাদ্য বাজিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের উৎসাহ দেওয়া।
উহুদের দিন কুরাইশরা তাঁদের অশ্বারোহী সৈনিকদের ডান দিকে খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং বাম দিকে ইকরিমা ইবন আবু জাহেলকে নিয়োগ করেছিলো। সেই দিন কাফিরদের এই দুই সাহসী যোদ্ধা মুসলমানদের কাছ থেকে উহুদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আসে কুরাইশদের জন্যে। উহুদের বিজয়ের পর কাফির নেতা আবু সুফিয়ান গর্ব করে বলেছিল ঃ এটা বদরের দিনের প্রতিশোধ ।
ইকরিমা তাঁর জীবনে ইসলামকে কখনও ছাড় দিতে চায় নি । নবী মুহাম্মাদ (সা) কে কিভাবে ধ্বংস করা যায় সেই চেষ্টা তাঁর মধ্যে ছিলো সবসময়। খন্দকের যুদ্ধের সময় কুরাইশ বাহিনী যখন মদিনা আক্রমণ করে , সেখানে কাফির রা খন্দকের কারণে মদিনায় প্রবেশ করতে না পেরে, বেশ কিছুদিন মদিনাকে অবুরুদ্ধ রাখলো। তখন এক সময় ইকরিমার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেলো। সে খন্দক পার করে মদিনার ভেতর প্রবেশ করার পথ খুঁজতে লাগলো এবং একসময় দেখতে পেলো খন্দকের এক স্থানে সংকীর্ন একটা পথ। ইকরিমা সাহস করে সেই পথ দিয়ে তাঁর ঘোড়া নিয়ে প্রবেশ করলো। এবং খন্দক পার হয়ে গেলো। তাঁর সাথে তাঁকে অনুসরণ করে খন্দক পার করলো আরও কিছু কাফির সৈনিক। কিন্তু ইকরিমা আর তাঁর সাথের সৈনিকেরা খুব বেশি সুবিধা করতে পারলো না । তাঁদের আক্রমণ করে বসলো মুসলিম বাহিনী। ইকরিমা এবং তাঁর সঙ্গীরা কোনভাবে মুসলমান সৈনিকদের আক্রমণ থেকে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে পালাল। সেই সময় ইকরিমার একজন সঙ্গি আমর ইবনু আব্দে উদ্দ আল আমিরী প্রাণ হারাল মুসলমান সৈনিকদের হাতে। এই ভাবে নানাবিধ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পরও ইকরিমা সবসময় নবী মুহাম্মাদের (সা) বিরোধিতা করে গেছেন। এমনকি মুসলমাণদের মক্কা বিজয়ের আগ মূহুর্তেও তিনিই শেষ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছেন।
এখন তিনি ব্যর্থ। সম্পূর্ন ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন মক্কা ছেড়ে। মুসলমানরা মক্কা বিজয় করে নিয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (সা) এর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে সকল মক্কা বাসির জন্যে সাধারণ ক্ষমা। তবে ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল এই সাধারণ ক্ষমার অন্তুর্ভুক্ত নয়। মোট ছয়জনকে এই সাধারণ ক্ষমার অন্তুর্ভুক্ত করা হয় নি। এরা হলেন ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল, আব্দুল্লাহ ইবনে আবু সারাহ , মাকিস ইবনে সুবাবা, আব্দুল্লাহ ইবনে খাতান এবং দুই জন মহিলা দাস। এদের অন্যায় হলো এরা মুসলমানদের বিপক্ষে নানাবিধ ষড়যন্ত্র করার পাশাপাশি , প্রকাশ্যে নবী মুহাম্মাদ (সা) কে গালমন্দ করতো। মুসলমানদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই ছয়জন ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হবে না। এরা যদি কাবার গিলাফ ধরেও নিরাপত্তা চায় তখনও এদের নিরাপত্তা দেয়া হবে না বরং যেখানেই এদের পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে।
সুতরাং যেচে পরে নিজেকে মুসলমানদের হাতে সঁপে দেয়ার কোন মানে হয় না। ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল তাই জাহাজে করে লোহিত সাগর দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। গন্তব্য এবিসিনিয়া। জাহাজে ওঠার পর সবকিছুই ঠিক ঠাক ছিলো। এখন আর কিছুই ঠিক আছে বলে মনে হচ্ছে না। ভয়াবহ ঝড় শুরু হয়েছে। ঢেউয়ের বাড়িতে মারাত্মক ভাবে দুলছে জাহাজ। যে কোন সময় ডুবে যাওয়ার উপক্রম। জাহাজের সবাই আতংকিত হয়ে পরেছে। জাহাজের কাপ্তান পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে সব আরোহীদেরকে – লাত, উজ্জা কিংবা অন্য কোন উপাস্যকে বাদ দিয়ে এক মাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে উদ্ভুদ্য করছে। তিনি সব আরোহীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেনঃ
হে মানুষেরা । প্রার্থনা করো। তোমাদের রব আল্লাহর কাছে মন থেকে অকপটে প্রার্থনা করো। কারণ এই পরিস্থিতি থেকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না ।
জাহাজের কাপ্তান যা তাঁর আরোহীদেরকে বলছে সেটা হলো , আল্লাহই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সবাইকে রক্ষা করতে পারে। অন্য কোন মূর্তি কিংবা দেবতা তাঁদেরকে কে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পারবে না। সুতরাং সবাই যেনো অন্যান্য দেবতাদের উপাসনা বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। যখন ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল জাহাজের নাবিকের কাছ থেকে এই কথা শুনলেন , তিনি বললেনঃ
ওয়াল্লাহি। যদি আমার দেব দেবী মূর্তির আমাকে সমুদ্রে এই পরিস্থিতিতে সাহায্য করার সামর্থ না থাকে , তাহলে জমিনেও আমাকে সাহায্য করার সামর্থ এদের নেই।
এরপর ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল একমাত্র আল্লাহর কাছে দুয়া করলেন। তিনি বললেনঃ
হে আল্লাহ.।আমি শপথ করছি, যদি আমি এই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরতে পারি। তাহলে আমি ফিরে যাবো এবং নবী মুহাম্মাদ (সা) এর হাতে হাত রেখে বায়াহ গ্রহণ করবো এবং আমি তাঁকে বিনয়ী এবং ক্ষমাশীল হিসেবেই পাবো।
ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল দুয়া করলেন একমাত্র আল্লাহর কাছে। ইখলাসের সাথে যেই দুয়া করা হয় সেই দুয়া কবুল হয়। দুয়া কবুলের ইখতিয়ার আল্লাহর । আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ইখলাসমিশ্রিত দোয়া কখনও ফিরিয়ে দেন না।
(২)
রাসুলুল্লাহ (সা) অবস্থান করছেন মক্কায়। বিশাল বিজয় এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর মক্কাবাসিরা এসে এসে দেখা করে যাচ্ছে নবীজি (সা) এর সাথে। এখন মক্কার মহিলাদের পালা। তাঁরা দলে দলে আসছেন নবিজী (সা) এর কাছ থেকে বায়াত গ্রহণ করতে। নবীজি (সা) তাঁর সাথে দেখা করতে আসা মক্কার মহিলাদের কথা শুনছেন। নবিজীর (সা) পাশে বসে আছেন তাঁর দুইজন স্ত্রী এবং তাঁর কন্যা ফাতিমা। বনী আব্দুল মুত্তালিবের বেশ কিছু মহিলারাও রয়েছে সেখানে। ইকরিমা ইবন আবু জাহেলের স্ত্রী উম্মু হাকীম এবং হিন্দ বিন্তু উতবাও এসেছেন রাসুলুল্লাহ (সা) এর সাথে দেখা করতে। হিন্দ ইবনে উতবা হলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী এবং আমীর মুয়াবিয়ার মা। তিনিই মুসলমানদের ওপর বিদ্বেষ বসতো উহুদের যুদ্ধে নবীজি (সা) এর প্রিয় চাচা হামযা (রা) এর কলিজা কেটে বেড় করে চিবিয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের এই দিনে তাই তিনি লজ্জা আর অনুশুচনায় মাথা আর মুখ ঢেকে এসেছেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ
ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) , সেই আল্লাহর প্রশংসা , যিনি তাঁর মনোনীত দ্বীন কে বিজয় দান করেছেন। আপনার এবং আমার মধ্যে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, সেই সূত্রে আমি আপনার কাছে ভালো ব্যবহারের আশা করি । এখন আমি একজন ইমানদার এবং বিশ্বাসী নারী।
এই কথা বলেই হিন্দ বিনতে উতবা তাঁর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) আমি হিন্দ বিনতু উতবা।
নবীজি (সা) হিন্দকে দেখে বললেনঃ খোশ আমদেদ।
ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা)। আল্লাহর কসম, হেয় এবং অপমানিত করার জন্যে আপনার বাড়ি থেকে আমার কাছে অধিক প্রিয় বাড়ি এই পৃথিবীতে আগে আর ছিলোনা। আর এখন আপনার বাড়ি থেকে অধিক সম্মানিত বাড়ি আমার কাছে দ্বিতীয়টি নেই ।
রাসুলাল্লাহ (সা) বললেনঃ আরও অনেক বেশি ।
হিন্দ বিনতু উতবার কথা শেষ হওয়ার পর ইকরিমার স্ত্রী উম্মু হাকিম উঠে দাঁড়িয়ে ইসলাম গ্রহণের স্বীকৃতি দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা) কে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা)। আপনি ইকরিমাকে হত্যা করতে পারেন, এ ভয়ে সে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে গেছে। আপনি তাঁকে নিরাপত্তা দিন , আল্লাহ আপনাকে নিরাপত্তা দেবেন।
নবীজি (সা) বললেনঃ সে নিরাপদ।
নিজের স্বামীর জন্যে রসুলুল্লাহ (সা) এর কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে উম্মু হাকিম বেড় হয়ে গেলেন স্বামীর সন্ধানে। তাঁর সাথে নিলেন তারই এক ক্রীতদাসকে।
ক্রীতদাস কে সাথে নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছেন উম্মু হাকিম। বিশাল পথ। সাথে রূমী ক্রীতদাস। লোকটার ভাব ভঙ্গি মোটেও ভালো মনে হচ্ছে না। উম্মুহাকিমের দিকে সে যে খারাপ নজরে তাকাচ্ছে সেটা এখন স্পষ্ট। একটা সময় এসে সে উম্মু হাকিমকে ভোগ করতে চাইলো । উম্মু হাকিম বিভিন্ন টালবাহানা করে নিজেকে ঐ দাসের হাত থেকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করলো। বেশ কিছু পথ পারি দেয়ার পর তাঁরা একটি আরব গোত্রের কাছে পৌঁছলেন। উম্মু হাকিম সেই গোত্রের কাছে সাহায্য কামনা করলেন এবং গোত্রের লোকজন তাঁকে সাহায্য করলো। তাঁরা ঐ ক্রীতদাসকে আটকে রাখলো। উম্মু হাকিম এবার একাই বেড় হয়ে গেলেন তাঁর স্বামী ইকরিমা ইবনে আবু জাহেলের খোঁজে। সমুদ্রের উপকুলে তিহামা নামের স্থানে উম্মু হাকিম পেয়ে গেলেন তাঁর স্বামী ইকরিমা কে ।
তিনি ইকরিমার কাছে গিয়ে বললেনঃ
হে আমার চাচাতো ভাই, আমি সর্বোত্তম সর্বশ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি। আমি তাঁর কাছে তোমার জন্যে নিরাপত্তা কামনা করেছি। তিনি তোমার নিরাপত্তা মঞ্জুর করেছেন। সুতরাং এরপরও তুমি নিজেকে ধ্বংস করো না ।
এ কথা শুনে ইকরিমা জিজ্ঞেস করেলেনঃ
তুমি কি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছো?
হ্যাঁ। আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।
ইকরিমার একটু সময় নিলেন। যখন আস্বত্ব হলেন , তখন উম্মুহাকিম এর সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন।
উম্মু হাকিম পথিমধ্যে ক্রিতদাসটির কু-মতলবের কথা সব জানিয়ে দিলেন ইকরিমাকে । ইকরিমা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি। তিনি ক্রীতদাসটির এই ঔদ্যত্ব আচরণের জন্যে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন এবং ক্রীতদাসটিকে হত্যা করলেন। এরপর দুজনে মিলে রাতটা কাটানোর জন্যে উঠলেন এক বাড়িতে। ইকরিমা তাঁর স্ত্রিকে কাছে পেয়েছেন। ভালোবাসার মানুষটাকে তিনি চাইলেন আরও কাছের করে নিতে। তিনি উম্মুহাকিমের কাছে আসলেন। উম্মুহাকিম বাঁধা দিলেন। তিনি ইকরিমাকে কঠোর ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বললেনঃ
‘আমি একজন মুসলিম নারী আর আপনি এখনও একজন মুশরিক’
উম্মুহাকিমের কাছ থেকে এরকম কিছু ইকরিমা আশা করেন নি একদমই।উম্মু হাকিম তাঁকে এমন মূহুর্তে প্রত্যাখ্যান করবে এটা হয়তো তাঁর ধারনাতেও ছিলো না। তিনি বেশ অবাক হলেন। তিনি উম্মু হাকিমকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
“ তোমার আর আমার মিলনের মাঝখানে যেই ব্যপারটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা তো খুব বিরাট ব্যপার।
সেই রাত পার করে তাঁরা মক্কার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা দেন। এদিকে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা) সাহাবিদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
খুব তারাতারি ইকরিমা (রা) কুফর ছেড়ে দিয়ে মুমিন হিসেবে তোমাদের কাছে আসছে। তোমরা তাঁর বাবাকে গালি দেবে না। কারণ মৃতকে গালি দিলে তা জীবিতদের মনে কষ্টের কারণ হয়। অথচ মৃতের কাছে তা পৌঁছায় না।’
রাসুলুল্লাহ (সা) এর কথা খুব দ্রুতই ফলে গেলো , উম্মুহাকিমকে নিয়ে ইকরিমা প্রবেশ করলেন মক্কায়। চলে এলেন রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে। রাসুলুল্লাহ (সা) বসে ছিলেন। ইকরিমাকে দেখেই আনন্দে উঠে দাঁড়ালেন। চাদরটাও গায়ে জড়ালেন না। এগিয়ে গেলেন ইকরিমার দিকে। তাঁর সামনে গিয়ে বসলেন। ইকরিমা দাঁড়িয়ে আছেন রাসুলুল্লাহ (সা) এর সামনে। তিনি নবিজী (সা) কে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
ইয়া মুহাম্মাদ, উম্মু হাকিম আমাকে বলেছে , আপনি আমাকে আমান দিয়েছেন।
সে সত্যি বলেছে। তুমি নিরাপদ। জবাব দিলেন নবিজী (সা)
মুহাম্মাদ আপনি কিসের দাওয়াত দিয়ে থাকেন?
আমি তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি তুমি সাক্ষ্য দেবে , আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর বান্দা এবং রাসুল। তুমি নামাজ কায়েম করবে। যাকাত দেবে।
রাসুলুল্লাহ (সা) ইকরিমাকে ইসলামের সবগুলো আরকাম বর্ননা করলেন ।
ইকরিমা বললেনঃ
আল্লাহর কসম। আপনি একমাত্র সত্যের দিকেই দাওয়াত দিচ্ছেন এবং কল্যাণের আদেশ দিচ্ছেন।
এই দাওয়াত দেয়ার আগেও আপনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী এবং সবচেয়ে সতকর্মশীল।
এই কথা বলেই ইকরিমা তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন নবিজী (সা) এর দিকে। তারপর বললেনঃ
‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্নাকা আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু।।
এরপর তিনি বললেনঃ
ইয়া রাসুলুল্লাহ , আমাকে এমন কিছু ভালো কথা শিখিয়ে দিন যা আমি বলতে পারি।
নবিজী(সা) বললেনঃ তুমি বলো, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু।
তুমি বলো, উশাহিদুল্লাহা ওয়া উশহিদু মান হাঁদারা আন্নি মুসলিমুন মুজাহিদুন মুহাজিরুন।’ – আল্লাহ ও উপস্থিত সবাই কে সাক্ষী রেখে আমি বলছি। আমি একজন মুসলিম , মুজাহিদ ও মুহাজির।
নবিজী যা বলতে বললেন , ইকরিমা সেটাই বললেন। এবার নবিজী ইকরিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ
অন্য কাউকে আমি দিচ্ছি এমন কোন কিছু যদি আজকে তুমি আমার কাছে চাও । আমি তোমাকে দেব।
ইকরিমা খুব ভালো একটা সুযোগ পেয়ে গেলেন। এখন রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে যা ইচ্ছা চেয়ে নেয়া যাবে। ইকরিমা বললেনঃ
আমি আপনার কাছে চাচ্ছি, যত শত্রুতা আমি আপনার সাথে করেছি, যত যুদ্ধে আমি আপনার মুখোমুখি হয়েছি । আপনের সামনে হোক কিংবা পেছনে , যত কথাই আমি আপনার বিরুদ্ধে বলেছি। এই সব কিছুর জন্যে আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্যে মাগফিরাতের দুয়া করুন।
রাসুলুল্লাহ (সা) এ কথা শুনে দুয়া করলেনঃ
হে আল্লাহ, যত শত্রুতাই সে আমার সাথে করেছে, তোমার নূরকে নিভিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়ে যত পথ সে ভ্রমণ করেছে, এই সবকিছুই আপনি ক্ষমা করে দিন। তাঁকে ক্ষমা করে দিন। আমার সামনে এবং আমার অগোচরে যতই মানহানি কর কথাই সে আমার ব্যপারে বলেছে , সেটাও আপনি ক্ষমা করে দিন।
নবিজীকে এই ভাবে দুয়া করতে শুনে ইকরিমার দারুণ আনন্দ হচ্ছে। নবিজী (সা) তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তিনি আল্লাহর কাছে ইকরিমাকে ক্ষমা করার জন্যে দুয়াও করেছেন। এর থেকে বড় পাওয়া এই মূহুর্তে ইকরিমার জন্যে আর কি হতে পারে। ইকরিমা বললনেঃ
ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) , আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্যে যত কিছু আমি ব্যয় করেছি তাঁর দ্বিগুণ আমি এখন ব্যয় করবো আল্লাহর রাস্তায়। আর আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্যে যত যুদ্ধে আমি অংশ গ্রহণ করেছি , তাঁর থেকে দ্বিগুণ যুদ্ধ আমি আল্লাহর রাস্তায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে করবো।
এই দিন ইকরিমা সম্পূর্ন রূপে প্রবেশ করেছিলো ইসলামে। এবং ইসলামে প্রবেশ করার পর তিনি যুদ্ধের ময়দানে যেমন সাহসের সাথে ঘোড়া দৌড়েছেন, ঠিক তেমনি আল্লাহর ইবাদাতেও নিজেকে দিয়েছেন বিলীন করে। তিনি কুরআনকে মুখের ওপর রেখে বলতেনঃ কিতাবু রাব্বি কালামু রাব্বি – আমার রব্বের কিতাব আমার রব্বের কালাম।
কথাটা বলতেই তাঁর চোখ ভিজে আসতো। ইকরিমা কাঁদতেন , তাঁর রব্বের ভালোবাসায় কাঁদতেন।
(৩)
ইয়ারমুখের যুদ্ধ চলছে। প্রায় এক থেকে তিন লক্ষ রোমান বাহিনী চব্বিশ থেকে চল্লিশ হাজার মুসলমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করছে । হাড্ডা হাড্ডি লড়াইয়ে বেশ কিছুদিন থেকে মুখোমুখি দুই বাহিনী। ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল (রা) রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন সাহসিকতার সাথে। এর মধ্যে সময় গত হয়েছে অনেক। নবিজী (সা) চলে গেছেন। চলে গেছেন খালিফাতুর রাসুলুল্লাহ আবু বকর সিদ্দিক (রা)। এখন সময় আমিরুল মুউমিনিন উমর বিন খাত্তাব (রা)এর । উমরের আমলে ইয়ারমুখের এই যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে চায় মুসলমান। তাঁরা ঝাঁপিয়ে পরেছে বিশাল কাফির বাহিনীর ওপর। চলছে ভয়াবহ যুদ্ধ। হঠাত মুসলিম বাহিনীর উপর দারুণ চাপ সৃষ্টি করেছে কুফফার রা। ইকরিমা (রা) ঘোড়া থেকে নেমে পরলেন। তাঁর তরবারি কোষমুক্ত করে তিনি রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে ঢুকে পরছেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ছুটে এলেন ইকরিমা (রা)র দিকে। তিনি ইকরিমা কে লক্ষ করে বললেনঃ
‘ইকরিমা এরকম কোর না। তোমার মৃত্যু মুসলমানদের জন্যে বিপদ জনক হবে।’
ইকরিমা (রা) বললেনঃ
খালিদ আমাকে ছেড়ে দাও। রাসুলের (সা) ওপর ঈমান আনার ব্যপারে তুমি আমার থেকে অগ্রগামী। আমার বাবা আর আমি ছিলাম আমাদের প্রিয় নবীজির (সা) সব চেয়ে বড় শত্রু। আমাকে আমার অতীতের কাফফারা আদায় করতে দাও। অনেক যুদ্ধই আমি রাসুলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে লড়েছি। আর আজ আমি রোমান বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে যাবো? এ আমার পক্ষে সম্ভব না।
এ কথা শেষ করেই ইকরিমা (রা) মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশ্যে হুংকার দিলেনঃ
আজ মৃত্যুর ওপর বায়াত করতে চায় কে ?
তাঁর এই আহবানে সারা দিলেন তাঁর চাচা হারিস ইবন হিসাম, দিরার ইবনুল আযওয়ার সহ আরও চারশ মুসলমান সৈনিক। তাঁরা খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) এর তাঁবুর সামনে থেকেই তুমুল যুদ্ধ শুরু করলেন। ইকরিমা ইবনে আবু জাহল বীরের মতো যুদ্ধ করলেন রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে । শত্রুদের ভেতর ঢুকে গিয়ে শত্রুদের ভীত নারীয়ে দিলেন। তাঁর সাথে মুসলমান চারশো জন সৈনিকও বীরের মতো যুদ্ধ করে ইয়ারমুখের ময়দানে ছিনিয়ে আনলেন বিরাট বিজয় এবং সম্মান ।
সময় গড়াল। যুদ্ধ প্রায় শেষ। বিশাল বিজয় ছিনিয়ে এনেছে মুসলিম বাহিনী। ইয়ারমুখের ময়দানে শাহাদাত বরন করা শত শত মুসলমান সেনাদের সাথে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পরে আছে হারিস ইবন হিসাম, আয়য়াশ ইবন আবী রাবিয়া এবং বীর যোদ্ধা ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল। হারিস ইবনে হিসামের অসম্ভব তৃষ্ণা পেয়েছে। তিনি তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পানি চাইলেন। কেউ একজন তাঁর জন্যে পানি নিয়ে এলো। তিনি পানি মুখে দেয়ার আগে দেখলেন ইকরিমা (রা) তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। পানি আর মুখে নিলেন না হারিস ইবনে হিসাম। তিনি বললেনঃ ইকরিমাকে দাও।
পানির পাত্রটি নিয়ে যাওয়া হলো ইকরিমার কাছে। ইকরিমা দেখলেন আয়য়াশ তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। ইকরিমা বললেনঃ আয়য়াশকে দাও।
আয়ায়াশের কাছে পানির পাত্রটি নিয়ে যাওয়া হলো। আয়য়াশ ততক্ষণে রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তারপর পানি নিয়ে আবার যখন ইকরিমা আর হারিসের কাছে ফেরা হলো। দেখা গেলো তাঁরা দুজনও আল্লাহর রাস্তায় তাঁদের জীবন কুরবান করেছেন। বীর যোদ্ধা ইকরিমা এবং হারিস মৃত্যু বরন করেছেন। ইকরিমা (রা) মৃত্যুর ওপর বায়াহ নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ওয়াদা পূর্ন করেছেন। সাহসিকতার সাথে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। আজ আমাদের এই মুসলিম উম্মাহর ইকরিমা ইবনে আবু জাহেলের মতো বীরদের খুব বেশি প্রয়োজন। আল্লাহ এই উম্মাহর নেতৃত্ব আবারও তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষগুলোর মতো মানুষের হাতে প্রদান করুন। আমীন।
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*