সুদ, ব্যাংক বিষয়ক প্রশ্নাবলী

By | Fri 25 Jumada Al Akhira 1438AH || 24-Mar-2017AD

প্রশ্ন ২৮৯৯:

ক) আমি ভবিষ্যতে একজন আইনজীবী (অ্যাডভোকেট) হতে ইচ্ছুক। কিন্তু কয়েকমাস যাবত আমি এ বিষয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছি যে, এই পেশাটি কি হালাল না হরাম? আমাদের দেশের প্রচলিত আইন সম্পর্কে আশা করি  অবগত আছেন। এই আইনের বেশীরভাগই (দেওয়ানী, ফৌজদারীসহ অন্যান্য আইন) মানব রচিত এবং ইসলামী আইনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমার প্রশ্নটি হচ্ছে এই সব বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় রেখে জানতে চাই যে, এই পেশাটি হালাল নাকি হারাম। যদি হালাল হয় তাহলে কীভাবে এই পেশায় নিয়োজিত থেকে অর্থ উপার্জন করা যাথাযথ হালাল হবে।

খ) বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব ইসলামী ব্যাংক রয়েছে সেখানে চাকরি করা জায়েয কি না এবং ঐ সব ব্যাংকে বিশেষ একাউণ্ট যথা-হজ্ব একাউণ্ট করা জায়েয কি না?

প্রশ্ন ৩৩৬২: সুদি ব্যাংক থেকে যে বৃত্তি দেওয়া হয় তা নেওয়া কি জায়েয?

প্রশ্ন ৩৪২০: সুদের টাকা দিয়ে মাদরাসা বা মসজিদের টয়লেট নির্মাণ বা পুননির্মাণ করা জায়েয হবে কি?

প্রশ্ন ৩৫৪২: প্রচলিত ব্যাংকে ট্রাঞ্জেকশন করা যাবে কি না? আর এসব ব্যাংকে চাকরি করা যাবে কি না, দয়া করে দলিল-প্রমাণসহ জানালে উপকৃত হব।

প্রশ্ন ৩৮৬৯: অনলাইনের মাধ্যমে কোনো ব্যাংকে চাকরির আবেদন ফরম পূরণে সহায়তা করা?

প্রশ্ন ৪৬১৩: আমি একটি জেনারেল (সুদী) ব্যাংকে প্রায় ৯ বছর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করেছি এবং এ সময়ে প্রাপ্ত বেতন-বোনাস দিয়ে গাড়ি-বাড়ি করেছি। পরবর্তীতে একসময় ‘সুদী ব্যাংকে চাকরি করা বৈধ নয়’ এ মাসআলা জানার পর সুদী কারবারের সাথে জড়িত থাকার কারণে নিজের মাঝে অনুশোচনা জাগে। ফলে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন অন্য একটি চাকরিতে যোগদান করেছি। এখন মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাচ্ছি, আগের চাকরির বেতন-বোনাস দিয়ে যে গাড়ি-বাড়ি করেছি তা আমার জন্য বৈধ কি না? যদি বৈধ না হয়ে থাকে তাহলে আমার এখন করণীয় কী? দয়া করে বিস্তারিত জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।


প্রশ্ন ২৮৯৯: 

ক) আমি ভবিষ্যতে একজন আইনজীবী (অ্যাডভোকেট) হতে ইচ্ছুক। কিন্তু কয়েকমাস যাবত আমি এ বিষয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছি যে, এই পেশাটি কি হালাল না হরাম? আমাদের দেশের প্রচলিত আইন সম্পর্কে আশা করি  অবগত আছেন। এই আইনের বেশীরভাগই (দেওয়ানী, ফৌজদারীসহ অন্যান্য আইন) মানব রচিত এবং ইসলামী আইনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমার প্রশ্নটি হচ্ছে এই সব বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় রেখে জানতে চাই যে, এই পেশাটি হালাল নাকি হারাম। যদি হালাল হয় তাহলে কীভাবে এই পেশায় নিয়োজিত থেকে অর্থ উপার্জন করা যাথাযথ হালাল হবে।

খ) বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব ইসলামী ব্যাংক রয়েছে সেখানে চাকরি করা জায়েয কি না এবং ঐ সব ব্যাংকে বিশেষ একাউণ্ট যথা-হজ্ব একাউণ্ট করা জায়েয কি না?

উত্তর

ক) দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের প্রচলিত আইনগুলো মানবরচিত একথা সঠিক। তবে এই আইনগুলোর মধ্যে অনেক আইন এমন আছে যা শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আপনি ঐ সকল মামলা পরিচালনা করতে পারবেন। আর যে সকল আইন ইসলামী শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোতে প্র্যাকটিস করা জায়েয হবে না।-ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৩২০

খ) ইসলামী ব্যাংকগুলোর কারবার পর্যবেক্ষণ করে এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, তারা নিজেদের বিনিয়োগ ইত্যাদিতে যথাযথ পন্থায় শরীয়ার অনুসরণ করে না। এই ব্যাংকগুলো সম্পর্কে এ অভিযোগটি অনেকেরই রয়েছে। তাই তাকওয়ার উপর চলতে চায় এমন ব্যক্তিদেরকে আমরা ব্যাংকে চাকুরির বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে থাকি।

আর হজ্ব করা দরকার নিরঙ্কুশ হালাল সম্পদ খরচ করে। এতে সন্দেহযুক্ত কোনো অর্থ যোগ করা ঠিক নয়।


প্রশ্ন ৩৩৬২: সুদি ব্যাংক থেকে যে বৃত্তি দেওয়া হয় তা নেওয়া কি জায়েয?

উত্তর: সুদি ব্যাংক থেকে প্রদত্ত বৃত্তি নেওয়া জায়েয নয়। কারণ ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ আয় সুদ। তাই তাদের বৃত্তির মাঝে সুদের আশঙ্কাই বেশি। অতএব এ টাকা যে নামেই দেওয়া হোক তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।    -রদ্দুল মুহতার ২/২৯২; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/১৭৪


প্রশ্ন ৩৪২০: সুদের টাকা দিয়ে মাদরাসা বা মসজিদের টয়লেট নির্মাণ বা পুননির্মাণ করা জায়েয হবে কি?

উত্তর: সুদের টাকা মূল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। যদি মালিক জানা না থাকে বা মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে ঐ টাকা সদকা করা ওয়াজিব। সেক্ষেত্রে ঐ টাকা কোনো গরীব-মিসকীনকে সদকা করে দিতে হবে। এ টাকা মসজিদ-মাদরাসার টয়লেটের কাজেও না লাগানো উচিত।    -শরহুল মাজাল্লাহ, মাদ্দাহ : ৯৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৮৫; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৪/১৭১


প্রশ্ন ৩৫৪২: প্রচলিত ব্যাংকে ট্রাঞ্জেকশন করা যাবে কি না? আর এসব ব্যাংকে চাকরি করা যাবে কি না, দয়া করে দলিল-প্রমাণসহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তর: প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো সুদী অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুদ আদানপ্রদানই এসব ব্যাংকের মূল ও প্রধান কাজ। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এসব ব্যাংকই হচ্ছে সুদের প্রচার ও প্রসারের প্রধান মাধ্যম।  আর ব্যাংকে কর্তব্যরত ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে সুদী কারবারের সাথে সরাসরি জড়িত। সুদ দেওয়া-নেওয়া যেমন হারাম তেমনি অন্যের সুদী কারবারে জড়িত হওয়াও হারাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু সুদদাতা ও গ্রহীতাকে লানত করেননি; বরং এর লেখক (অর্থাৎ সুদের হিসাব-কিতাবকারী) ও সাক্ষীগণকেও অভিসম্পাত করেছেন।

হযরত জাবির রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ গ্রহণকারী ও সুদ প্রদানকারী এবং সুদের লেখক ও সাক্ষীদ্বয়ের উপর লানত করেছেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮

সুতরাং একজন মুসলমানের জন্য প্রচলিত ধারার ব্যাংকে চাকরি করা এবং এর বেতনাদি ভোগ করা বৈধ নয়।

আর সুদভিত্তিক হওয়ায় এসব ব্যাংকে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব বা বিভিন্ন মেয়াদের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা কিংবা সুদের ভিত্তিতে যে কোনো ধরনের ঋণ গ্রহণ করা হারাম। কেউ এমন হিসাব খুলে ফেললে তা দ্রুত বন্ধ করে দিতে হবে এবং এ থেকে প্রাপ্ত সুদ সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে।

অবশ্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকে চলতি হিসাব খোলা, টিটি, পে-অর্ডার ইত্যাদি সুদবিহীন লেনদেন করা জায়েয। -তাফসীরে কুরতুবী ৩/২২৫ (সূরা বাকারা : ২৭৫); তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/২১৯


প্রশ্ন ৩৮৬৯: আমি ও আমার বড় ভাই মিলে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার পরিচালানায় আছি। আমাদের এখানে অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন চাকরির আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজে ভর্তি ইত্যাদি ফরম পূরণ করা হয়। আমার জানামতে, ব্যাংকে চাকরি করা জায়েয নয়। তবে আমাদের জন্য কি অনলাইনের মাধ্যমে কোনো ব্যাংকে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করা জায়েয হবে? নাকি নাজায়েয হবে? দয়া করে এর উত্তর দিয়ে আমাদের উপকৃত করবেন।

উত্তর: প্রচলিত ধারার ব্যাংকে চাকরি করা নাজায়েয। কেননা এ ব্যাংকগুলোর প্রধান ও মূল কাজই হল সুদের আদান-প্রদান। সুতরাং ব্যাংকের চাকরির জন্য আবেদন ফরম পূরণ করে দেওয়া নাজায়েয কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ করেছেন-

وَ تَعَاوَنُوْا عَلَی الْبِرِّ وَ التَّقْوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ ۪ .

এবং নেকি ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা কর এবং গুনাহের কাজ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করো না। -সূরা মায়েদা (৫) : ২

অতএব ব্যাংকের ফরম পূরণে সহযোগিতা করা বৈধ হবে না।


প্রশ্ন ৪৬১৩: আমি একটি জেনারেল (সুদী) ব্যাংকে প্রায় ৯ বছর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করেছি এবং এ সময়ে প্রাপ্ত বেতন-বোনাস দিয়ে গাড়ি-বাড়ি করেছি। পরবর্তীতে একসময় ‘সুদী ব্যাংকে চাকরি করা বৈধ নয়’ এ মাসআলা জানার পর সুদী কারবারের সাথে জড়িত থাকার কারণে নিজের মাঝে অনুশোচনা জাগে। ফলে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন অন্য একটি চাকরিতে যোগদান করেছি।

এখন মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাচ্ছি, আগের চাকরির বেতন-বোনাস দিয়ে যে গাড়ি-বাড়ি করেছি তা আমার জন্য বৈধ কি না? যদি বৈধ না হয়ে থাকে তাহলে আমার এখন করণীয় কী? দয়া করে বিস্তারিত জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।

উত্তর:

সুদী প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যে আয় দিয়ে গাড়ি-বাড়ি বা অন্য যে সম্পদ গড়েছেন, তা ভোগ করা জায়েয হবে না। এখন আপনি যদি এ গাড়ি-বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ থেকে বৈধভাবে উপকৃত হতে চান, তাহলে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে এ গাড়ি-বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ ক্রয় করেছেন, সে পরিমাণ টাকা সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত গরিব-মিসকিনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। এভাবে যতটুকু সদকা করবেন ততটুকু সম্পদ আপনার জন্য হালাল বলে বিবেচিত হবে।

উল্লেখ্য, গাড়ি-বাড়ি করার পর এগুলো ভাড়ায় দিয়ে থাকলে তা থেকে উপার্জিত টাকাও সদকা করে দিতে হবে এবং পিছনের জীবনে হারাম উপার্জন ও হারাম ভোগ-ব্যবহারের কারণে আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে।

-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮; বাদায়েউস সানায়ে ৬/১৪৫; ফাতহুল কাদীর ৮/২৫৮; আলবাহরুর রায়েক ৮/১১৪


 

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*