যানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর পর্ব ০২

By | Fri 9 Jumada Al Akhira 1437AH || 18-Mar-2016AD

যানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কিত মাসিক আল-কাউসার পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্কলন এই পোস্টটি। যে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া আছে এই পোস্টে তা নিচে দেয়া হলঃ

  1. (আ-কাঃ  ৩৫১০) (ক) আমরা জানিমৃত ব্যক্তিকে কবরে তিনটি সওয়াল করা হবে। কিন্তু এমনও লোক আছে যাদের মৃত্যু হয় আকাশে বা সাগরে যাদের লাশ মাটিতে দাফন করার সুযোগ হয় না। তাদেরকে কোথায় সুওয়াল করা হবে?(খ) অনেক মানুষের লাশ সাগরে দাফন করা হয়ে থাকে সেটিই বা বৈধ কতটুকু?(গ) সাধারণ মানুষ তো আছেই অনেক আলেমকেও দুআর সময় বলতে শুনিহে আল্লাহ! অমুকের রূহের মাগফিরাত করুন। আসলে অমুকের রূহের মাগফিরাত করুন হবেনাকি হে আল্লাহ! অমুককে মাফ করে দিন কোনটি সঠিক?(ঘ) কবর যিয়ারতের সময় কোন দিকে ফিরে দুআ-দরূদ পড়ব?(ঙ) কবর সামনে রেখে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা যাবে কি?
  2. (আ-কাঃ  ৩৪২৯)মেঝ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে মৃত বড় ভাইয়ের জানাযা পড়ানো ঠিক বা জায়েয হয়েছে? আর মেঝ ভাইয়ের জন্য দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অধিকার ছিল কি না?তিনিও তো বড় ভাইয়ের ওলি এবং আমার চেয়ে যোগ্যও বেশি।
  3. (আ-কাঃ ৩৪৮২)গায়েবানা জানাযা নামায বৈধ কি না? আর নাজাশীর ঘটনা দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণিত হয় কি না?
  4. (আ-কাঃ ২৭৫৭) অনেকে বলে, মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর কিছু সময় ধরে মৃতের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করতে হয়। আবার কেউ কেউ বলে, একটি উট জবাই করে তার গোশত কেটেকুটে বণ্টন করতে যতটুকু সময় লাগে কবরের পাশে ততটুকু সময় অপেক্ষা করতে হয়। সঠিক বিষয় জানিয়ে বাধিত করবেন।
  5. (আ-কাঃ ১৬৯৫) সাধারণত পুরুষদের লাশে সুগন্ধি লাগানো হয়। এখন জানার বিষয় হল, মহিলাদের লাশেও কি সুগন্ধি লাগানো যাবে?
  6. (আ-কাঃ ১৫৮৯) আমাদের এলাকায় মৃতের রূহের মাগফিরাত কামনার উদ্দেশ্যে তিন, সাত, একুশ ও চল্লিশ ইত্যাদি তারিখে কুরআন খতম, মিলাদ ও দুআর অনুষ্ঠান করা হয় এবং জাঁক-জমকের সাথে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে বোঝা যায় না যে, রূহের মাগফিরাত না, বিবাহর অনুষ্ঠান। এ ধরনের অনুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গ্রামবাসী ও এলাকার বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ, যেমন চেয়ারম্যান, মেম্বার, মাতবর, পার্টির নেতাসহ সবাইকে দাওয়াত করা হয়। এমনকি অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ পর্যন্ত দৈনিক পত্রিকায় ঘোষণা করা হয়। যা আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় তামদারী, মজলিস, বেপার, ফয়তা, মিদুনী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। যে এলাকাতে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, উদ্দেশ্যে অভিন্ন। একশ্রেণীর আলেম এ ধরনের অনুষ্ঠান যথারীতি করে যাচ্ছেন। আরেক শ্রেণীর আলেম এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। ভালো মন্দ কিছুই বলেন না। আরেক শ্রেণীর আলেম এই অনুষ্ঠানগুলোকে বিদআত ও নাজায়েয বলে থাকেন। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। কোনটা সহীহ আর কোনটা ভুল তা পার্থক্য করতে পারছে না। এখন প্রশ্ন এই যে, এই পদ্ধতি শরীয়তসম্মত কি না।
  7. (আ-কাঃ ১৫৩৪) একজন ইমাম সাহেব জানাযার নামাযে মাত্র তিন তাকবীর বলেই সালাম ফিরিয়েছেন। তাকে অবগত করার পর তিনি বলেন, সমস্যা নেই। নামায সহীহ হয়েছে। তাকবীর কম হলে নামায অশুদ্ধ হয় না। কিন্তু মৃত ব্যক্তির অভিভাবকরা এ কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে পরের দিন অন্য ইমাম এনে কবরের উপর নামায পড়েছে। প্রশ্ন হল, জানাযা সহীহ হয়েছে কি না? কবরের উপর দ্বিতীয় জানাযা পড়াতে কোনো অসুবিধা হবে কি না?

উত্তরগুলোর সাথে আল-কাউসারের প্রশ্ন নং উল্লেখ করা হল যাতে আমরা আল-কাউসার থেকে খুজে নিতে পারি প্রয়োজন হলে।


প্রশ্ন ৩৫১০: (ক) আমরা জানিমৃত ব্যক্তিকে কবরে তিনটি সওয়াল করা হবে। কিন্তু এমনও লোক আছে যাদের মৃত্যু হয় আকাশে বা সাগরে যাদের লাশ মাটিতে দাফন করার সুযোগ হয় না। তাদেরকে কোথায় সুওয়াল করা হবে?

(খ) অনেক মানুষের লাশ সাগরে দাফন করা হয়ে থাকে সেটিই বা বৈধ কতটুকু?

(গ) সাধারণ মানুষ তো আছেই অনেক আলেমকেও দুআর সময় বলতে শুনিহে আল্লাহ! অমুকের রূহের মাগফিরাত করুন। আসলে অমুকের রূহের মাগফিরাত করুন হবেনাকি হে আল্লাহ! অমুককে মাফ করে দিন কোনটি সঠিক?

(ঘ) কবর যিয়ারতের সময় কোন দিকে ফিরে দুআ-দরূদ পড়ব?

(ঙ) কবর সামনে রেখে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা যাবে কি?

উত্তর:

ক) মৃত্যুর পর সওয়াল-জওয়াব এবং এর পরবর্তী প্রতিদান ও শাস্তি ইসলামী আকীদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৃত্যুর পর সওয়াল-জওয়াব হওয়ার জন্য লাশ মাটিতে দাফন করা এবং লাশ অক্ষত থাকা জরুরি নয়; বরং এ সময়ে বান্দার দেহ যেখানে যেভাবে থাকুক আল্লাহ তাঁর কুদরতে ঐ দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক করে দিবেন এবং সওয়াল-জওয়াব ও শান্তি বা শাস্তি সব কিছুই হবে। লাশ মাটিতে দাফন করা হোক বা না হোক এবং লাশ অক্ষত থাকুক বা না থাকুক এর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান এবং হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা.সহ অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আগে এক ব্যক্তি ছিল, যে মৃত্যুর সময় তার ছেলেদেরকে অসিয়ত করেছে যে, আমি তো আল্লাহর নিকট কোনো ভালো আমল জমা রাখিনি। জেনে রাখ,আমি যখন মৃত্যুবরণ করব তোমরা আমার দেহকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে প্রবল বাতাসের দিন সমুদ্রে উড়িয়ে দিবে। অতপর ছেলেরা অসিয়তমতে মৃত্যুর পর তার দেহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে প্রবল বাতাসের দিন সমুদ্রে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরে আল্লাহ তাআলা ঐ ছাইগুলো জমা করে তাকে জীবিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাকে এ কাজে কিসে প্ররোচিত করল? সে বলল, একমাত্র আপনার ভয়ই আমাকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিলেন। -সহীহ বুখারী,হাদীস ৬৪৮০, ৬৪৮১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭৫৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২৩৩৫৩; কিতাবুর রূহ ৭৪; মিরকাতুল মাফাতীহ ১/৩১০

খ) সাগরের মাঝে নৌযানে কারো ইন্তিকাল হলে নৌযানটি যদি তীরের নিকটবর্তী হয় এবং অবতরণ করা সম্ভব হয় বা নৌযান গন্তব্যে পৌঁছার আগে লাশে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটার আশঙ্কা না থাকে তাহলে লাশ ভূমিতেই দাফন করতে হবে। আর যদি নৌযান থেকে ভূমিতে অবতরণ করার আগে আগে লাশে পরিবর্তন ঘটার আশঙ্কা থাকে তাহলে নৌযানেই তার গোসল, কাফন ও জানাযা দিয়ে লাশটি সাগরে ছেড়ে দিবে। সম্ভব হলে লাশের সাথে কোনো ভারি বস্তু যেমন পাথর ইত্যাদি বেঁধে দিবে। যাতে লাশ নিচে চলে যায়। পানিতে ভেসে না থাকে। -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১৯৭৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩৫; ফাতহুল কাদীর ২/১০২; ইমদাদুল ফাত্তাহ ৬৩৯

গ) মৃত্যুর পর শান্তি ও আযাব রূহ এবং দেহ উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো শুধু রূহের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। এটিই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা। তাই কেউ যদি রূহের মাগফিরাত দ্বারা এমন উদ্দেশ্য করে যে, শাস্তি বা শান্তি শুধু রূহেরই হবে তাহলে সেটি ভুল হবে। তাই কথাটি এভাবে বলা উচিত হবে, হে আল্লাহ অমুকের মাগফিরাত করুন। রূহের মাগফিরাত করুন- এমনটি না বলাই ভালো। কেননা এতে কারো ভুল বোঝার আশঙ্কা রয়েছে। -কিতাবুর রূহ ৬৫-৬৭; ফাতহুল বারী ৩/২৭৫;মিরকাতুল মাফাতীহ ১/৩১০; শরহুস সুদূর ২৪৩

ঘ) কবর যিয়ারতের নিয়ম হল, মাইয়েতের চেহারার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সালাম দিবে। অতপর দরূদ শরীফ ও কুরআন মাজীদ থেকে  তিলাওয়াত করতে চাইলে করতে পারবে। অবশ্য উক্ত নিয়মে দাঁড়ানো সম্ভব না হলে যেভাবে সম্ভব সেভাবে দাঁড়াতে পারবে। যিয়ারত শেষে চাইলে কেবলামুখী হয়ে কবরবাসীর জন্য মাগফিরাতের দুআ করতে পারবে। -জমে তিরমিযী, হাদীস ১০৫৩; আলআওসাত, ইবনুল মুনযির ৫/৫০৭; রদ্দুল মুহতার ২/২৪২; মাজমাউল আনহূর ৪/২২০; মিরকাতুল মাফাতীহ ৪/২১৯

ঙ) কবরকে সামনে রেখে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা জায়েয আছে। হাদীস শরীফে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার শিয়রে সূরা বাকারার প্রথম এবং শেষের কয়েকটি আয়াত পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।

তাই কবরের সামনে কুরআন মাজীদ পড়া দোষণীয় নয়। তবে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে বিনিময় নিয়ে কুরআন মাজীদ খতম করার যে প্রচলন রয়েছে তা সম্পূর্ণ বিদআত ও নাজায়েয। -আল মুজামুল কাবীর, তবারানী ১৯/২২০; আলবাহরুর রায়েক ২/১৯৫; মিরকাতুল মাফাতীহ ৪/১৭৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৬; ফাতাওয়া খানিয়া ১/১৬২; ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালিজিয়া ২/৩১৯


প্রশ্ন ৩৪২৯: কিছুদিন আগে আমার বড় ভাই ইন্তেকাল করেছেন। মেঝ ভাই ঢাকা থাকেন। তার দিকে লক্ষ্য করেই জানাযার সময় ঠিক করা হয়কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছতে পারেননি। তার জন্য অপেক্ষা করতে চাইলে লোকজন বিরক্তিবোধ করে। তাই আমি জানাযা পড়িয়ে দিই।

মেঝ ভাইও আলেম। তার সাথে জানাযা পড়ার জন্য অনেকেই প্রথম জানাযায় শরীক হয়নি। জানাযা শেষ হওয়ার পাঁচ-সাত মিনিট পর মেঝ ভাই পৌঁছে যান। তখন যারা প্রথম জানাযায় শরীক হয়নি তারা মেঝ ভাইকে দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ানোর জন্য খুবই জোর করে। কিন্তু মেঝ ভাই তা করেননি। ফলে লোকজন তার সাথে খুবই রাগ করেন এবং এ বিষয়কে কেন্দ্র করে এলাকার মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়।

এখন জানার বিষয় হলআমার জন্য কি মেঝ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে মৃত বড় ভাইয়ের জানাযা পড়ানো ঠিক বা জায়েয হয়েছেআর মেঝ ভাইয়ের জন্য দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অধিকার ছিল কি না?তিনিও তো বড় ভাইয়ের ওলি এবং আমার চেয়ে যোগ্যও বেশি।

উত্তর: প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে আপনার মেঝ ভাই যেহেতু উপস্থিত হতে পারেনি তাই আপনার জন্য জানাযা পড়ানো ঠিক হয়েছে এবং জায়েযও হয়েছে। আর এক্ষেত্রে মেঝ ভাইয়ের দ্বিতীয়বার জানাযা না পড়াও শরীয়তসম্মত হয়েছে। কেননা মৃতের এক ভাইয়ের উপস্থিতিতে জানাযা পড়া হয়ে গেলে অন্য ভাইয়ের জন্য দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার অধিকার থাকে না।

-আদ্দুররুল মুখতার ২/২২০, ২/২২৩; হাশিয়াতুত তহতাবী আলাদ্দুর ১/৩৭৬; আলবাহরুর রায়েক ২/১৮০; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৬২-৬৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৪


প্রশ্ন ৩৪৮২: আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যেকোনো বড় ব্যক্তি মারা গেলে তার গায়েবানা জানাযা পড়া হয়ে থাকে। আমাদের এলাকার কয়েকজন আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা এ পদ্ধতিকে সঠিক বলেন। তারা বলেন যেরাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাবাশার বাদশাহ নাজাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন। 

এখন জানার বিষয় হলগায়েবানা জানাযা নামায বৈধ কি নাআর নাজাশীর ঘটনা দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণিত হয় কি নাদয়া করে বিস্তারিত জানাবেন।

উত্তর: জানাযা নামায আদায়ের জন্য মৃতের লাশ সামনে উপস্থিত থাকা জরুরি। অনুপস্থিত লাশের গায়েবানা জানাযা নামায সহীহ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় তাঁর অসংখ্য সাহাবী মদীনার বাইরে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম থেকে তাদের গায়েবানা জানাযা পড়ার প্রমান নেই। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের জানাযার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, তোমাদের যে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আমাকে জানাবে। কারণ আমার জানাযা নামায তার জন্য রহমত।-সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩০৮৩

আর শুধু নাজাশীর জানাযা পড়াটা ব্যাপকভাবে গায়েবানা জানাযা জায়েয হওয়াকে প্রমাণ করে না। এছাড়া মুসনাদে আহমদ ও সহীহ ইবনে হিব্বানে নাজাশীর জানাযা সম্পর্কিত একটি হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, নাজাশীর লাশ কুদরতিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনেই উপস্থিত ছিল।

ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ভাই নাজাশী ইন্তেকাল করেছে। সুতরাং তোমরা তার জানাযা আদায় করো। ইমরান রা. বলেন, অতপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন। আর আমরা তাঁর পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। অতপর তিনি তার জানাযা পড়ালেন। আমাদের মনে হচ্ছিল যে, নাজাশীর লাশ তাঁর সামনেই রাখা ছিল। -মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২০০০৫;সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩০৯৮

এছাড়া অনেক মুহাদ্দিসগণ নাজাশীর জানাযা সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ ঘটনাটি বিশেষ এক প্রয়োজনের কারণে সংঘটিত হয়েছিল। তা হল, নাজাশীর মৃত্যু হয়েছিল এমন এক ভূখণ্ডে যেখানে তার জানা পড়ার মতো কোনো (মুসলিম) ব্যক্তি ছিল না। তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ নিয়মের বাইরে তার জানাযা পড়িয়েছেন।

আল্লামা যায়লায়ী রাহ., আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম ও আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ.  এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (দেখুন : নাসবুর রায়া ২/২৮৩; যাদুল মাআদ ১/৫০২; ফয়যুল বারী ২/৪৭০

উলামায়ে কেরাম এ ঘটনার আরো অন্যান্য ব্যাখ্যাও প্রদান করেছেন।

যা হোক, এটা ছিল নববী জীবনের স্বাভাবিক রীতি বহির্ভূত মাত্র একটি ঘটনা। এর উপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে প্রচলিত গায়েবানা জানাযাকে বৈধ বলার সুযোগ নেই। কেননা অনুসৃত সুন্নাহর সাথে এটির কোনো মিল নেই।

এছাড়া যে লাশের কোথাও জানাযার ব্যবস্থা আছে এবং তার জানাযা হয়েছে বা হচ্ছে তার গায়েবানা জানাযা পড়ার একটি ঘটনাও হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায় না। তাই এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

-সহীহ বুখারী, হাদীস ৪০৯০; ফাতহুল কাদীর ২/৮০, ৮১; আলমাবসূত, সারাখসী ২/৬৮; বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৮; মাজমাউল আনহুর ১/২৭২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৪; রদ্দুল মুহতার ২/২০৯; ইলাউস সুনান ৮/২৮৩


প্রশ্ন  ২৭৫৭ : অনেকে বলে, মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর কিছু সময় ধরে মৃতের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করতে হয়। আবার কেউ কেউ বলে, একটি উট জবাই করে তার গোশত কেটেকুটে বণ্টন করতে যতটুকু সময় লাগে কবরের পাশে ততটুকু সময় অপেক্ষা করতে হয়। সঠিক বিষয় জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: প্রশ্নের উভয় বক্তব্যই সঠিক। দাফনের পর কবরের পাশে কিছু সময় পর্যন্ত মৃতের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করা মুস্তাহাব। এটি হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত।

উসমান ইবনে আফফান রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাইয়্যেতকে দাফন করার পর সেখানে অবস্থান করতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। এবং তার জন্য দৃঢ়তার দুআ কর। (অর্থাৎ আল্লাহ যেন তাকে ঈমানের উপর অটল রাখেন এবং সকল প্রশ্নের উত্তর দানের তাওফীক দান করেন।) কেননা এখনই সে জিজ্ঞাসিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩২১৩)

আর উট জবাই করে গোশত বণ্টন করা পরিমাণ সময় অবস্থান করার কথা আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমে এসেছে, আবদুর রহমান ইবনে শামাসাহ আলমাহরী বলেন, আমর ইবনুল আস রা. যখন মুমূর্ষু অবস্থায়  তখন আমরা উপস্থিত ছিলাম। তিনি আমাদের বললেন, আমি মৃত্যুবরণ করলে কোনো বিলাপকারিনী এবং আগুন যেন আমার সঙ্গী না হয়। অতঃপর তোমরা যখন আমাকে দাফন করবে তখন কবরে পর্যাপ্ত মাটি দিবে। এরপর একটি উট জবাই করে তার গোশত বণ্টন করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় আমার কবরের পাশে (দুআ, তিলাওয়াত ও ইস্তিগফার করার জন্য) অপেক্ষা করবে। যেন তোমাদের (তিলাওয়াত ও ইস্তিগফার-এর) মাধ্যমে আমার নিঃসঙ্গতা দূর হয় এবং আমার রবের ফেরেশতাদের জবাব দিতে পারি।

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১/৭৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩২১৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৬; ফাতহুল মুলহিম ১/২৭৩


প্রশ্ন  ১৬৯৫: সাধারণত পুরুষদের লাশে সুগন্ধি লাগানো হয়। এখন জানার বিষয় হল, মহিলাদের লাশেও কি সুগন্ধি লাগানো যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, মহিলাদের লাশেও সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব।

-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৪১৬; শরহুল মুনইয়্যাহ পৃ. ৫৭৯; হাশিয়াতুত্তাহতাবী আলাদ্দুর ১/৩৬৭; আননাহরুল ফায়েক ১/৩৮৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬১; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৩


 

প্রশ্ন ১৫৮৯: আমাদের এলাকায় মৃতের রূহের মাগফিরাত কামনার উদ্দেশ্যে তিন, সাত, একুশ ও চল্লিশ ইত্যাদি তারিখে কুরআন খতম, মিলাদ ও দুআর অনুষ্ঠান করা হয় এবং জাঁক-জমকের সাথে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে বোঝা যায় না যে, রূহের মাগফিরাত না, বিবাহর অনুষ্ঠান। এ ধরনের অনুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গ্রামবাসী ও এলাকার বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ, যেমন চেয়ারম্যান, মেম্বার, মাতবর, পার্টির নেতাসহ সবাইকে দাওয়াত করা হয়। এমনকি অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ পর্যন্ত দৈনিক পত্রিকায় ঘোষণা করা হয়। যা আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় তামদারী, মজলিস, বেপার, ফয়তা, মিদুনী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। যে এলাকাতে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, উদ্দেশ্যে অভিন্ন।

একশ্রেণীর আলেম এ ধরনের অনুষ্ঠান যথারীতি করে যাচ্ছেন। আরেক শ্রেণীর আলেম এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। ভালো মন্দ কিছুই বলেন না। আরেক শ্রেণীর আলেম এই অনুষ্ঠানগুলোকে বিদআত ও নাজায়েয বলে থাকেন। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। কোনটা সহীহ আর কোনটা ভুল তা পার্থক্য করতে পারছে না। এখন প্রশ্ন এই যে, এই পদ্ধতি শরীয়তসম্মত কি না। সহীহ পদ্ধতি কোনটা তা জানালে আমরা বিভ্রান্তির বেড়াজাল হতে বের হয়ে সেভাবে আমল করার জন্য সচেষ্ট থাকব।

উত্তর: মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য দুআ করা এবং বিভিন্ন নফল ইবাদত যেমন-দান-সদকা, তাসবীহ-তাহলীল, তেলাওয়াত ইত্যাদি করে তার সওয়াব মৃতকে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল, যা হাদীস শরীফের বহু দলীল দ্বারা প্রমাণিত। তবে এটি একটি ব্যক্তিগত আমল। কোনো দিন-তারিখ ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই যখন ইচ্ছা তখনই এ আমল করা যায়।

কিন্তু বর্তমানে এই সহজ আমলটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দান করে অনেক ক্ষেত্রেই তাকে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের কাজে রূপান্তর করা হয়ে থাকে। যেমন-

১. তিন দিনা, সাত দিনা,একইশা, চল্লিশা এ সকল নামে এ অনুষ্ঠান যথাক্রমে মৃত্যুর ৩য়, ৭ম, ২১ শ ও ৪০ তম তারিখে করাকে জরুরি মনে করা হয় বা কমপক্ষে এরূপ ধারণা রাখা হয় যে, এ তারিখগুলোর বিশেষত্ব রয়েছে। অথচ শরয়ী দলীল-প্রমাণ ছাড়া বিশেষ দিন-তারিখ নির্ধারণ করে নেওয়া বিদআত ও নাজায়েয।

২. ঈসালে সাওয়াবের প্রচলিত পন্থায় আরেকটি বড় আপত্তিকর দিক হল এতে যিয়াফত তথা আড়ম্বরপূর্ণ দাওয়াত অনুষ্ঠানকেই ঈসালে সওয়াবের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। অথচ শরীয়র্তে যিয়াফতের আয়োজনের কথা তো আছে আনন্দের মুহূতে, মুসিবতের মুহূর্তে নয়। হাদীস শরীফে এসেছে-হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আলবাজালী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (তরজমা) ‘আমরা (সাহাবাগণ) দাফনের পর মৃতকে কেন্দ্র করে সমবেত হওয়া ও খাবারের আয়োজন করাকে ‘নিয়াহা’ বলে গণ্য করতাম।’ (মুসনাদে আহমদ ২/২০৪; ইবনে মাজাহ ১৬১২)

কোনো দিন-তারিখ নির্ধারিত না করে গরীব-মিসকীনদেরকে খানা খাওয়ানোটাও ঈসালে সাওয়াবের একটি বৈধ পন্থা। কিন্তু এমন যিয়াফতের আয়োজন করা যাতে অনেক ক্ষেত্রে সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদেরকে  প্রাধান্য দেওয়া হয় এটি আদৌ ঈসালে সাওয়াবের গ্রহণযোগ্য পন্থা নয়।

৩. হাফেযদের দ্বারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরআন খতম করা হয়। অথচ এক্ষেত্রে কুরআন পড়ার বিনিময় দেওয়া-নেওয়া নাজায়েয।

৪. অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যয়ভার নির্বাহ করা হয় মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া এজমালী সম্পদ থেকে, ওয়ারিশদের মাঝে কোনো নাবালেগ থাকলেও তার সম্পদ বাদ দেওয়া হয় না। অথচ নাবালেগের সম্পদ তার অনুমতি নিয়েও খরচ করা নাজায়েয। এমনিভাবে বালেগ ওয়ারিশদের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষ রাখা হয় না যে, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি আছে কি না।

৫. এ ধরনের অনুষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই লোক দেখানোর জন্য বা সামাজিক রেওয়াজে প্রভাবিত হয়ে করা হয়। এটাও নাজায়েয। শরীয়ত বিরোধী এ জাতীয় আরো কর্মকান্ড এসব অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে। ফলে এর দ্বারা মৃত ব্যক্তির উপকার হওয়া তো দূরের কথা উল্টো ব্যবস্থাকারীগণ গুনাহগার হয়ে থাকে।

সুতরাং ঈসালে সাওয়াবের প্রশ্নোক্ত পন্থা সম্পূর্ণরূপে পরিহারযোগ্য। মৃতের মাগফিরাত কামনা ও তাকে সাওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগতভাবে দান-সদকা, তেলাওয়াত, যিকির-আযকার ও নফল ইবাদতই যথেষ্ট এবং এটাই করণীয়। আর নির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখের অপেক্ষা না করে নিজ নিজ তাওফীক অনুযায়ী এগুলো মাঝে মধ্যেই করা দরকার। দান-সদকা করার ক্ষেত্রে গরীব দুঃখীদেরকে নগদে প্রদান করা ভালো এবং সদকায়ে জারিয়া হয় এমন খাতে ব্যয় করা উত্তম।

-মুসনাদে আহমদ ২/২০৪; ইবনে মাজাহ পৃ. ১১৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/১৭০; শিফাউল আলীল ১/১৭৫; ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ১/৮১; রদ্দুল মুহতার ২/২৪০


প্রশ্ন ১৫৩৪: একজন ইমাম সাহেব জানাযার নামাযে মাত্র তিন তাকবীর বলেই সালাম ফিরিয়েছেন। তাকে অবগত করার পর তিনি বলেন, সমস্যা নেই। নামায সহীহ হয়েছে। তাকবীর কম হলে নামায অশুদ্ধ হয় না। কিন্তু মৃত ব্যক্তির অভিভাবকরা এ কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে পরের দিন অন্য ইমাম এনে কবরের উপর নামায পড়েছেপ্রশ্ন হল, জানাযা সহীহ হয়েছে কি না? কবরের উপর দ্বিতীয় জানাযা পড়াতে কোনো অসুবিধা হবে কি না?

উত্তর: চার তাকবীরের কম হলে জানাযা সহীহ হয় না। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে প্রথম জানাযা নামাযে একটি তাকবীর কম হওয়ায় সেটি আদায় হয়নি। আর পরবর্তীতে কবরকে সামনে নিয়ে যে জানাযা পড়া হয়েছে তা আদায় হয়েছে এবং শরীয়তসম্মতই হয়েছে। কারণ জানাযা ছাড়া দাফন করা হলে কিংবা আদায়কৃত নামায ফাসেদ হলে দাফনের পরও লাশ পচে যাওয়ার আগে কবরকে সামনে নিয়ে জানাযা পড়া যায়।

-সহীহ বুখারী ১/১৭৭-১৭৮; সহীহ মুসলিম ১/৩০৯; উমদাতুল কারী ৮/১৩৮; বাদায়েউস সানায়ে ২/৫৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/২২৪

 

যানাজা বিষয়ক প্রশ্নের অন্য পর্বগুলির লিঙ্কঃ

যানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর পর্ব ০১

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

2 thoughts on “যানাজা ও দাফন কাফন সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর পর্ব ০২

    1. Jalal Uddin Post author

      وأنتم فجزاكم الله خيرا
      আপনার কমেন্টের জন্য ধন্যবাদ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করেন।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*