উম্মাহর নক্ষত্ররাজি : তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু

By | Thu 28 Safar 1442AH || 15-Oct-2020AD
বুসরা-র বাজারে একজন খৃস্টান ধর্মযাজক এসে ঘোষণা করলেনঃ “হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়! আপনারা জিজ্ঞেস করুন বাজারে আগত লোকদের মধ্যে কোনো মক্কাবাসী আছে কিনা।”
তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিকটেই ছিলেন। তিনি দ্রুত তার কাছে গিয়ে বললেনঃ “জ্বি, আমি মক্কার লোক।”
ধর্মযাজক : তোমাদের মধ্যে আহমাদ কি আত্মপ্রকাশ করেছেন?
তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) : কোন আহমাদ?
ধর্মযাজক : আবদুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। এই সেই মাস, যে মাসে তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন। তিনি হবেন শেষ নবী। মক্কায় আত্মপ্রকাশ করে কালো পাথর ও খেজুর উদ্যান বিশিষ্ট ভূমির দিকে হিজরাত করবেন। হে যুবক, অতি শীঘ্রই তোমার তাঁর কাছে যাওয়া উচিত।
.
ধর্মযাজকের উপদেশ তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- র অন্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেললো। তিনি তাঁর বাণিজ্য এবং কাফিলা রেখেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। বাড়িতে পৌঁছে লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তিনি যাওয়ার পর মক্কায় নতুন কিছু ঘটেছে কিনা। লোকেরা জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেকে নবী বলে দাবী করেছে এবং আবু কুহাফার ছেলে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর অনুসারী হয়েছে।”
__
তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর সহিত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -র অত্যন্ত সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। তিনি আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি সত্যি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত দাবী করেছেন এবং আপনি তাঁর অনুসারী হয়েছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ”। এরপর তিনি তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন।
তৎক্ষণাৎ তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খৃস্টান ধর্মযাজকের ঘটনাটি খুলে বললেন। অতঃপর আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে সঙ্গে করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গেলেন। আর সেখানে কালিমা শাহাদাত পাঠ করে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।
আল্লাহু আকবার।
মূলত তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন।
__
ইসলাম গ্রহণের পর তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সান্নিধ্যে প্রায় সকল যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, বদর যুদ্ধে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ না করলেও পরোক্ষভাবে তাঁর অবদান ছিলো সক্রিয়।
.
উহুদের যুদ্ধ,
হিজরী তৃতীয় সনে মক্কার মুশরিকদের সাথে সংঘটিত উহুদের যুদ্ধে তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাহসিকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি এক হাতে তলোয়ার ও অন্য হাতে বর্শা নিয়ে কাফিরদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালান।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে, আনসারদের বারোজন এবং মুহাজিরদের একজন (তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া বাকি সকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং সেখানে শত্রুবাহিনী তাঁকে ঘিরে ধরলো। এ সময় শত্রুর আক্রমণে সকল আনসার সাহাবী নিহত হোন। কেবল তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একাই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে রক্ষা করেন।
উহুদের যুদ্ধে তিনি ব্যাপক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাঁর শরীর এবং হাত আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন উহুদ যুদ্ধের হিরো।
• আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উহুদ যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠলেই বলতেনঃ “সে দিনটির সবটুকুই তালহার”।
[That day, that entire day, belonged to Talha.]
এছাড়াও,
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “একজন শহীদকে পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াতে দেখে যদি কেউ আনন্দ পেতে চায়, সে যেন তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ কে দেখে।”
[Whoever would like to see a martyr walking on the face of the earth, let him look at Talhah ibn ‘Ubaidullah]
আর এ কারণে তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে “জীবিত শহীদ” বলা হতো।
সুবহানআল্লাহ।
__
তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-র অন্যতম গুণ ছিলো দানশীলতা। তিনি প্রচুর দান করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে “তালহা-তু-আল-ফায়্যাদ” অর্থাৎ Talha-the-Generous হিসেবে উল্লেখ করেন।
একবার হাদরামাউত থেকে তাঁর কাছে প্রায় সত্তর হাজার দিরহাম এলো। এত অর্থ পেয়ে তিনি বিমর্ষ ও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-র কন্যা উম্মু কুলসুম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র পরামর্শে পরের দিনই তিনি সমস্ত দিরহাম দান করে দিলেন।
আরেকদিন একজন লোক এসে তাঁর কাছে সাহায্য চাইলো। আর তিনি তাকে নিজ জমি বিক্রি করে ৩ লাখ দিরহাম দান করলেন।
সুবহানআল্লাহ।
.
আর এভাবেই প্রতিনিয়ত আল্লাহ পাক এর সন্তুষ্টি অর্জন, যুদ্ধক্ষেত্র এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুরক্ষায় অসামান্য অবদান রাখার দরুন জীবদ্দশায় তিনি জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেন এবং অন্তর্ভুক্ত হোন “আশরায়ে মুবাশশারাহ” দশজন মহিয়ান সাহাবীর তালিকায়।
____
আল্লাহু আ’লাম
রেফারেন্সঃ
• A Companion of the Prophet : Talhah ibn ‘Ubaidullah
• আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (প্রথম খন্ড)
• Biography and Martyrdom of “Talhah ibn ‘Ubaidullah”
____
লিখাটি ফেসবুক এর “Know Your Heroes – উম্মাহর নক্ষত্ররাজি” পেইজ থেকে নেয়া
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*