উম্মাহর নক্ষত্ররাজি : উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা

By | Thu 28 Safar 1442AH || 15-Oct-2020AD
উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রাদিয়াল্লাহু আনহা): সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন যে মহিয়সী নারী
_____
এমন একটি পরিবেশ, পরিবার – যা ছিলো জাহিলিয়্যাতের অন্ধকারে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত। কিন্তু সে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশেই আল্লাহ তা’আলা-র অনুগ্রহে হিদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত হলেন এক মহিয়সী নারী। পরবর্তীতে তিনি-ই হয়ে উঠলেন বিশ্বাসীদের একজন থেকে বিশ্বাসীদের মাতা – “সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রাদিয়াল্লাহু আনহা)”।
.
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে উল্লেখ করেন, “ইবাদাত, ধার্মিকতা, দুনিয়াবিমুখীতা এবং দানশীলতায় তিনি ছিলেন অন্যতম সেরা নারী।” [১]
সুবহানআল্লাহ।
___
উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভঃ
হিজরী সপ্তম সন,
মুসলমানদের বিরুদ্ধে খায়বারের ইহুদীদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে রাসূল ﷺ এর নেতৃত্বে খায়বার এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ইহুদীদের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে৷
এতে সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর পিতা ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের প্রধান হুয়াই বিন আখতার, ভাই ও স্বামী নিহত হন।
.
সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) যুদ্ধের গণিমত হিসেবে মুসলমানদের অধীনে আসেন এবং গণিমত বন্টনের সময় প্রথমে দাহইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর অধিকারপ্রাপ্ত হোন।
.
যেহেতু সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ বংশীয়, তাই সাহাবীরা রাসূল ﷺ -কে বললেন, “ইয়া রাসূল ﷺ !! বনু কুরাইজা ও বনু নাদীরের অন্যতম নেত্রীকে আপনি দাহইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -কে দিচ্ছেন? সে তো আপনারই উপযুক্ত।”
.
রাসূল ﷺ তাঁদের পরামর্শটি আমলে নিলেন। তিনি দাহইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সমেত ডেকে পাঠালেন।
এরপর তাঁকে সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র পরিবর্তে অন্য দাসী নির্বাচন করতে বললেন।
.
রাসূল ﷺ সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) -কে বললেন,
“তুমি যদি ইসলাম কবুল করতে সম্মত হও, তবে আমি তোমাকে নিজের জন্য গ্রহণ করব।
আর তুমি যদি ইহুদী থাকাটাকেই প্রাধান্য দাও, তবে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিব এবং তুমি তোমার লোকজনের নিকট ফিরে যাবে।”
.
সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল ﷺ -কে নিজ সিদ্ধান্ত জানালেন,
“ইয়া রাসূল ﷺ !! আপনি আমাকে দাওয়াহ প্রদানের পূর্বেই আমি ইসলাম গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছি এবং আপনাকে নবী হিসেবে স্বীকার করেছি। ইহুদীদের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের মাঝে আমার কোনো অভিভাবক নেই। মুক্ত হয়ে নিজ গোত্রে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ -ই আমার নিকট অধিক প্রিয়।”
[২]
.
আল্লাহু আকবার।
জীবনের এমন নাজুক পরিস্থিতিতেও সত্য গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র বিলম্বিত হয়নি তাঁর।
সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র এ সিদ্ধান্তে রাসূল ﷺ আনন্দিত হলেন এবং তাঁকে মুক্ত করে উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় ভূষিত করলেন।
___
ভালোবাসাময় দাম্পত্যঃ
রাসূল ﷺ ও সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র দাম্পত্য জীবন ছিলো অত্যন্ত প্রেমময়।
একদিন রাসূল ﷺ সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-র ঘরে গিয়ে দেখলেন তিনি কাঁদছেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করাতে তিনি বলেন, “আয়িশা ও যায়নাব (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) দাবি করে যে, তাঁরা অন্য বেগমগণের চেয়ে উত্তম। কারণ তাঁরা আপনার বেগম হওয়া ছাড়াও আপনার আত্মীয়। কিন্তু আমি একজন ইহুদীর কন্যা।”
.
রাসূল ﷺ তাঁকে খুশি করার জন্য বলেন, “তুমি তাদেরকে কেনো বললে না, আমার বাবা হারুন (আলাইহিস সালাম), চাচা মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং আমার স্বামী মুহাম্মদ ﷺ । এ কারণে তোমরা আমার চেয়ে উত্তম হও কীভাবে!” [৩]
সুবহানআল্লাহ। কতই না অসাধারণ উপায়ে রাসূল ﷺ স্ত্রীকে সম্মানিত করলেন।
_
অসুস্থ অবস্থায় রাসূল ﷺ তখন মৃত্যু শয্যায়। সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সহ অন্যান্য স্ত্রীগণ স্বামীর সেবা করতে একত্রিত হয়েছেন।
এসময় রাসূল ﷺ এর কষ্ট দেখে সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ব্যথাতুর হৃদয়ে বলে উঠলেন, “হে আল্লাহ-র নবী, আপনার সব কষ্ট, যন্ত্রণা যদি আমিই ভোগ করতাম, খুশি হতাম।”
তাঁর কথা শুনে বাকিরা সন্দেহ পোষণ করতে লাগলেন।
তখন রাসূল ﷺ বললেন, “আল্লাহ-র কসম সে সত্য বলেছে।” [৪]
এমনই ভালোবাসা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিলো উভয়ের দাম্পত্যজীবন।
_____
সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন অত্যন্ত উদারচিত্তের অধিকারিনী।
উম্মুল মুমিনীন হয়ে মদিনায় আসার পর তাঁর নিজের কানের সোনার দুলদ্বয় ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ও নবীপত্নীদের মাঝে ভাগ করে দেন।
আর যে ঘরটিতে তিনি বসবাস করতেন তা জীবিত অবস্থাতেই দান করে গিয়েছিলেন।
.
সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর জীবন ছিলো সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত। ইবাদাত বান্দেগী, দুনিয়াবিমুখতা, ধৈর্যশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য। আর এ আদর্শ অনুসরণ করে আমরাও যেন হতে পারি তাঁরই মতো, আমীন।
_____
(আল্লাহু আ’লাম)
রেফারেন্সঃ
[১] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ ৮/৪৭
[২] তাবাকাত ইবন সাআদ, ৮/১২১-১২৩ (সংক্ষেপিত)
* The Prophet Marries Hz. Safiyya (RA)
[৩] সুনান, তিরমিযী
[৪] তাবাকাত ইবন সাআদ, ৮/১২৮
লিখাটি ফেসবুক এর “Know Your Heroes – উম্মাহর নক্ষত্ররাজি” পেইজ থেকে নেয়া
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*