উম্মাহর নক্ষত্ররাজি : উম্মুল মুমিনীন জুয়াইরিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা

By | Thu 28 Safar 1442AH || 15-Oct-2020AD
উম্মুল মুমিনীন জুয়াইরিয়াহ বিনতুল হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহা) : নিজ গোত্রের জন্য কল্যানময়ী হয়ে উঠেছিলেন যে মহিয়সী নারী
______
তিনি ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আত্মমর্যাদায় বলিষ্ঠ একজন নারী। বনু মুসতালিক এর যুদ্ধে তাঁর বন্দিত্ব, পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য তাঁর চেষ্টা তাদবীর এবং পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভের মাধ্যমে নিজ গোত্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনা- এ সবই অত্যন্ত তাৎপর্যমন্ডিত ঘটনা।
.
আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ করেন, “আমি কোনো নারীকে তার সম্প্রদায়ের জন্য জুয়াইরিয়াহ থেকে অধিকতর কল্যাণময়ী হতে দেখিনি।”
সুবহানআল্লাহ।
___
উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভঃ
বনু মুসতালিক এর যুদ্ধ,
এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেন গোত্রের নেতা আল-হারিস ইবন দিদার। তারই কন্যা ছিলেন জুয়াইরিয়াহ বিনতুল হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহা)।
.
যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে এবং বন্দি সকলকে দাস-দাসী ঘোষণা করে সৈন্যদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হয়। তাদের মাঝে জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ও ছিলেন। তিনি সাবিত ইবন কায়িস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -র ভাগে পড়ছিলেন। কিন্তু দাসীর জীবন তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে চাইলেন না।
.
তিনি সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর নিকট মুকাতাবা-র (চুক্তি) আবেদন করলেন। সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নয় উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদানে রাজী হলেন। জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এর নিকট সে সময় কোনো অর্থ ছিলো না। কিন্তু তিনি মনস্থির করলেন, অন্যের দ্বারস্থ হয়ে হলেও তিনি চুক্তিকৃত অর্থ সংগ্রহ করবেন।
.
অতঃপর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললেন,
– “ইয়া রাসূলুল্লাহ !! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি জুয়াইরিয়াহ, আমার গোত্রপতি হারিস ইবন দিদারের কন্যা। এ ব্যাপারে আপনি অবগত হয়ে থাকবেন।
আমি আমার মুক্তিপণের জন্য সাবিত ইবন কায়িস এর সাথে নয় উকিয়া স্বর্ণের মুকাতাবা করেছি। কিন্তু আমি সে অর্থ পরিশোধ করতে পারছি না। তাই আপনার নিকট এই প্রত্যাশা নিয়ে এসেছি যে, আপনি আমার চুক্তিবদ্ধ অর্থ পরিশোধে সাহায্য করবেন।”
.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
– তুমি কি এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করো না?
– তা কি, ইয়া রাসূলুল্লাহ?
– রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তোমার হয়ে তোমার চুক্তিকৃত অর্থ পরিশোধ করি এবং তোমাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করি।”
.
জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তখন বিধবা, একই সাথে তাঁর সামনে ছিলো এক পরাধীন জীবনের শৃঙ্খল। তাই এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে তিনি (রাদিয়াল্লাহু আনহা) অত্যন্ত খুশি হলেন এবং সম্মতি প্রকাশ করলেন।
.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর চুক্তিকৃত অর্থ পরিশোধ করে জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) -কে স্বাধীন জীবন এবং নিজ স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন। [১]
.
মুসলমানদের মধ্যে এ বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লো। তাঁরা বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু মুসতালিক গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করেছেন। তাই তারা কখনো দাস-দাসী হতে পারেনা। এরপর সকলে মিলে পরামর্শ করে সকল বন্দীকে মুক্ত করে দিলেন।
আর এভাবেই জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) -র উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় ভূষিত হোন এবং এর দ্বারা নিজ গোত্রের মাঝে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন।
আল্লাহু আকবার।
___
ইবাদাতে মগ্নতাঃ
জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিতঃ
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভোরে তাঁর নিকট থেকে বাইরে গেলেন। আর তিনি (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ফজরের সালাত শেষ করে স্বীয় জায়নামাযে বসে রইলেন।
.
চাশতের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এসে তাঁকে একই অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ
– “আমি যে অবস্থায় তোমাকে রেখে বাইরে গেলাম, সে অবস্থাতেই কি তুমি এতক্ষন রয়েছ?”
– তিনি উত্তর দিলেন, “জ্বি”।
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন,
“তোমার নিকট থেকে যাওয়ার পর আমি চারটি বাক্য তিনবার করে পড়েছি এবং তা যদি সকাল থেকে (এ যাবৎ) তোমার পঠিত দু’আর সহিত ওজন করা হয়, তাহলে তা ওজনে সমান হয়ে যাবে। আর তা হচ্ছেঃ [২]
ﺳُﺒْﺤَﺎﻥَ اللَّهِ ﻭَﺑِﺤَﻤْﺪِﻩِ ﻋَﺪَﺩَ ﺧَﻠْﻘِﻪِ، ﻭَﺭِﺿَﺎ ﻧَﻔْﺴِﻪِ، ﻭَﺯِﻧَﺔَ ﻋَﺮْﺷِﻪِ، ﻭَﻣِﺪَﺍﺩَ ﻛَﻠِﻤَﺎﺗِﻪِ
– “সুবহা-নাল্লা-হি ওয়া বিহামদিহী আদাদা খালক্বিহী, ওয়া রিদ্বা নাফসিহী, ওয়া যিনাতা আরশিহী, ওয়া মিদা-দা কালিমা-তিহ্।” (৩ বার)
অর্থঃ আল্লাহ-র সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করি; তাঁর সৃষ্টির সংখ্যা পরিমাণ, তাঁর নিজ সন্তুষ্টি অনুযায়ী, তাঁর আরশের ওজন পরিমাণ এবং এবং তাঁর কালাম সমূহের সংখ্যা পরিমাণ।
___
জুয়াইরিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) -এর মাঝে প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ, কোমলতা এবং ইবাদাত বান্দেগীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিলো। হাদীসের একাধিক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছে এসে তাঁকে তাসবীহ ও তাহলীলে মশগুল দেখতে পেতেন। [৩]
আর তাঁর আদর্শ গ্রহণ করে আমরাও যেন হয়ে উঠতে পারি তাঁরই মতো। আমীন।
_____
(আল্লাহু আ’লাম)
রেফারেন্সঃ
[১] সুনান আবি দাঊদঃ হাদীস নংঃ ৩৯৩১ (আংশিক)
[২] সহীহ মুসলিমঃ হাদীস নং ২৭২৬ (a), রিয়াদুস স্বালেহীনঃ ১৪৪১
[৩] সাহাবিয়্যাত হাওলার রাসূল (মহিয়সী নারী সাহাবীদের আলোকিত জীবন); লেখক – শায়খ মাহমূদ আল-মিসরী আবু আম্মার; অনুবাদক – কাজী আবুল কালাম সিদ্দিক
• Juwayriyah bint Al-Harith (RA) – From a war captive to a wife of the Prophet (PBUH)
• Article & Lecture
_____
লিখাটি ফেসবুক এর “Know Your Heroes – উম্মাহর নক্ষত্ররাজি” পেইজ থেকে নেয়া
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*