পর্দার বিধানঃ পর্ব ১

By | Thu 13 Rabi Al Awwal 1437AH || 24-Dec-2015AD

[This article written and compiled by Brother Sabet Bin Mukter and Published in his Facebook Account]

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

প্রদর্শন ও আকর্ষণ 

পর্দার কথা বললেই এক শ্রেণীর মানুষ বলে উঠেন “ফতোয়াবাজ”। অথচ আমাদের এই ভাইয়েরা জানেন না এটা কোন হুজুরের দেয়া বিধান নয়, এই পর্দার বিধান স্বয়ং আল্লাহ্‌ সুবহানু তায়ালাই আমাদেরকে দিয়েছেন।  

পুরুষের পর্দা হল দৃষ্টির হিফাজত করা আর নারীর পর্দা হলো সারা শরীর মহান আল্লাহ্‌র হুকুমমতো ঢেকে রাখা যেন পরপুরুষ দেখে আকৃষ্ট না হয়।

 

নিজেকে অন্যের সামনে ফুটিয়ে তোলা বা প্রদর্শন এবং অন্যকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করা বা আকর্ষণ -এ ধরণের মানসিকতা অনেকের মাঝেই থাকে।

 

এ মানসিকতা নারী পুরুষ সকলের মাঝেই বিদ্যমান। তবে নারীর মাঝে তুলনামূলক বেশি থাকে।কারণ আল্লাহ পুরুষকে দৈহিক কোমলতা ও কমনীয়তা দিয়ে সৃষ্টি করেননি এবং সাজ-সজ্জা বা অলংকার গ্রহণের অনুমতি দেননি। পৃথিবীর যত স্বর্ণ সব নারীর জন্য, পুরুষের জন্য তা হারাম। যত রেশমী বস্ত্র সব নারীর জন্য পুরুষের জন্য তা নিষিদ্ধ। মনি-মুক্তা হিরা জহরত আরো কত শত অলংকার সব নারীর জন্য। রূপ-সৌন্দর্যের সবটুকুই যেন আল্লাহ দিয়েছেন নারীকে। কোমলতা কমনীয়তা শুধুই নারীর অধিকার। নারীর রূপ-সৌন্দর্য নিয়ে রচিত হয়েছে কত শত কবিতা।সুতরাং আকর্ষণ ও প্রদর্শনের প্রবণতা নারীর মাঝে বেশি পরিমাণে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু আল্লাহর শাশ্বত বিধান হলো, সবকিছুতে পরিমাণ ও পরিমিতিবোধ বজায় রাখা। তিনি মানুষকে দিয়েছেন স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার সীমারেখা। আর তা মানুষেরই কল্যাণার্থে। আল্লাহর দেয়া স্বাধীনতা ও নেয়ামত ভোগের ক্ষেত্রে তাঁর সীমারেখা লংঘনই যত অনর্থের মূল।  নারীর রূপ-সৌন্দর্যের ব্যবহার ও এর সীমারেখা হিসেবে আল্লাহ দিয়েছেন পর্দার বিধান। পর্দায় ইসলামের যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে তার অন্যতম হল, পর পুরুষের সামনে সাজ-সজ্জাও রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা এবং পরপুরুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করা থেকে বিরত থাকা।

 

১.প্রদর্শন

 বিয়ে-বাড়িতে বা যে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে হবে। সেখানে শত পুরুষের সামনে নিজেকে প্রদর্শন করতে হবে(এখন তো বলতে হয় অনেক মা ভাবে, মেয়েকে প্রদর্শন করতে হবে) সুতরাং সাধ্যমত সুন্দর পোশাক পরতে হবে এবং সবচেয়ে সুন্দর সাজে সাজতে হবে। নিজে নিজে সাজলে হবে না বরং পার্লারে গিয়ে সাজতে হবে। এমনিভাবে নিজেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। রং ঢং অঙ্গ-ভঙ্গী সব হতে হবে পরিশীলিত।

এই হল প্রদর্শনের মানসিকতা। কোনো ক্ষেত্রে সন্তানের মানসিকতা কোনো ক্ষেত্রে সন্তান মা-বাবা সকলের মানসিকতা। এই মানসিকতা অজান্তে সন্তানের বা পরিবারের সর্বনাশ ডেকে আনছে। আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করছে। দুনিয়া-আখেরাত সব বরবাদ করছে। সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার পর মা-বাবা সমাজ সবাই ভাবছে,হায় হায় কী হয়ে গেল।

এরূপ প্রদর্শন আল্লাহর দেয়া রূপ সৌন্দর্যের নেয়ামতের চরম না-শুকরী ও হঠকারিতা।রূপ-সৌন্দর্য তো আল্লাহর দান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,আমি তো সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে। অতঃপর আমি তাকে হীনতাগ্রস্তদের হীনতমে পরিণত করি। (সূরা তীন: ৪-৫)

অর্থাৎ স্বীয় কর্মদোষে সে অবনতির নিম্নস্তরে পৌছে।

আরো স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন চেহারার নেয়ামতের কথা ,”হে মানুষ! কোন জিনিস তোমাকে তোমার সেই মহান প্রতিপালক সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তোমাকে সুগঠিত করেছেন ও তোমাকে সুসামঞ্জস্য করেছেন। যেই আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন। (সূরা ইনফিতার : ৬-৮)

সুতরাং কীভাবে আমি তা দ্বারা তাঁর নাফরমানীতে লিপ্ত হই? আর নেয়ামতের না-শুকরীর পরিণাম তো ভয়াবহ।

কুরআনের ভাষায় প্রদর্শনকে বলে ‘তাবাররুজ’ যা জাহেলিয়াতের নারীদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তা থেকে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-

“(পরপুরুষকে) সাজ-সজ্জাপ্রদর্শন করে বেড়িও না, যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত (আহযাব:৩৩)

তাছাড়া এটা এমন গুনাহ যা শুধু নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় বরং অন্যকেও পাপ করতে প্ররোচিত করা হয়। ফলে তার পাপের দায়ও নিজের কাঁধে চলে আসে। পাপের বোঝা ভারী হয়।

 

আর আল্লাহ বলেননি যে, নারী সাজ-সজ্জা গ্রহণ করতে পারবে না, বরং স্বর্ণ ও সাজ-সজ্জারযত সরঞ্জাম সব নারীর জন্য; পুরুষের জন্য তো হারাম। অলংকার পরবে শুধু নারী, পুরুষ নয়। 

তবে আল্লাহ নারীকে অলংকার গ্রহণের ও রূপ সৌন্দর্য্য প্রকাশের সীমারেখা বলে দিয়েছেন, যাতে নারী বিপদের সম্মুখীন না হয়। বলে দিয়েছেন যতো খুশি সাজো কিন্তু স্বামী, পিতা, ভাই ইত্যাদি মাহরাম পুরুষের সামনে ছাড়া তা প্রদর্শন করো না। ইরশাদ হয়েছে-

“…তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, আপননারীগণ, মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অংগ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ছাড়া অন্য কারো সামনে নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।” (সূরা নূর : ৩১)

সাজ-সজ্জার প্রকাশ এমনভাবে কেন করব এবং এমন ক্ষেত্রে কেন করব যা বিপদ ডেকে আনে। আমাদের নিজেদের বিবেক দিয়েই তা উপলব্ধি করা উচিত।

 

২.আকর্ষণ

 সকলের দৃষ্টি আমার দিকে ফেরাতে হবে। এ জন্য আমাকে যত ধরণের সাজ-সজ্জা আছে সব গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় পোশাক পরতে হবে;স্কীন টাইট, শর্ট, পাতলা ফ্যালফ্যালা আরো কত কী। চুল বিশেষ ধরণের কালার করতে হবে বা খোপা বাঁধতে হবে আকর্ষণীয় ঢংয়ে বা চুল কাটতে হবে বিশেষ স্টাইলে। ভ্রু প্ল্যাক করতে হবে। দু একটি নখ রাখতে হবে ইয়া লম্বা। দুল, লিপস্টিক,নেল পালিশ সব হতে হবে ম্যাচিং করে। সুগন্ধী ব্যবহার করতে হবেনামী দামী ব্রান্ডের। আরো কত কী! অঙ্গভঙ্গী, কথার আওয়াজও স্টাইল, হাঁটার ঢং সব হতে হবে আকর্ষণীয়। মোট কথা,যে কোন মূল্যে নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে পেশ করতে হবে।

এই যে মানসিকতা, একবার ভেবে দেখেছি, তা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আমার স্রষ্টা যিনি আমাকে দান করেছেন রূপ-সৌন্দর্য তাঁর রহমত থেকে আমি কত দূরে সরে যাচ্ছি! মানুষকে আমার প্রতি আকর্ষণ করছি আর আল্লাহর রহমত থেকে নিজেকে কতটা দূরে ঠেলে দিচ্ছি! 

আমি ঐসব নারীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছি না তো যাদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

কতক নারী আছে যারা পোশাক পরেও নগ্ন, যারা (পরপুরুষকে) আকর্ষণকারী ও (পরপুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট। যারা বুখতী উটের হেলানো কুঁজের মত মাথা বিশিষ্ট। এরা জান্নাতের সুবাস পর্যন্ত পাবে না। (অর্থাৎ মাথা এমনভাবে বাঁধে যেন মনে হয় উটের কুজ।)

(সহীহ মুসলিম, হাদীস:২১২৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস:৮৬৬৫)

এভাবে পরপুরুষকে আকর্ষণ করলে নারী বিপদের সম্মুখীন হয়। পত্রিকার পাতা উল্টালেই আমরা এরভুরি ভুরি নযীর দেখতে পাই।

ইসলাম নারীকে নিরাপদ রাখতে আকর্ষণের ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে যা মেনে চললে নারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

নারীর স্বর কোমল ও আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। যা স্বভাবতই পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে। সুতরাং প্রয়োজনে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় নারীকে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।(প্রয়োজনে শব্দটি এ জন্য বললাম যে,বিনা প্রয়োজনে বেগানা নারী-পুরুষ গাল-গল্প করাও ফিৎনার অন্যতম কারণ) সাথে সাথে  এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে যে, কথার বাক্য ও বিষয়বস্ত্ত যেন অশালীন না হয়।

একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি বলে দিয়েছেন-

“যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল স্বরে কথা বলো না।এতে যার অন্তুরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হবে। এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলো। (সূরা আহযাব:৩২)

নারীর নূপুরের ঝংকার পুরুষের মনে দোলা দেয়। কিন্তু তা যেন শয়তানকে সাহায্য না করে। নারীকে বিপদে না ফেলে পরপুরুষের কু-বাসনা জাগিয়ে না তোলে। অপ্রকাশিত সাজ-সজ্জাও যেন প্রকাশ পেয়ে না যায় তাই আল্লাহ নারীকে সজোরে পদক্ষেপ না ফেলতে বলেছেন।

ইরশাদ করেছেন-

নারীরা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। (সূরা নূর:৩১)

আর সুগন্ধি আকর্ষণের এমন একটি মাধ্যম যা দৃষ্টি-অবনত ব্যাক্তিকেও আকৃষ্ট করে। সুতরাং এ বিষয়ে কতটা সতর্ক থাকা দরকার তা নিজেরাই ভেবে দেখি। হাদীস শরীফে এসেছে- (অর্থ) ‘‘প্রত্যেক চোখ যিনা করে। আর কোন নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোন মজলিশের পাশ দিয়ে যায় তাহলে সে এই, এই (অর্থাৎ সেও নযরের যিনা বা সরাসরি যিনার প্রতি প্রলব্ধুকারী হিসেবেগণ্য) (জামে তিরমিযী, হাদীস:২৭৮৬)

 

যারা বোরখা পরেন

যারা বোরখা পরেন তাদেরকে মোবারকবাদ। আর যারা পরেন না তাদের জন্য শুভকামনা। আমি বলছি নাযে, বোরখা পরলেই পূর্ণ পর্দা হয়েগেল বরং বোরখা পর্দার একটি বড় মাধ্যম। আসল কথা হল, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল(সঃ) পর্দাবিষয়ক যত নির্দেশনা দিয়েছেন তা যথাযথ মেনে চলতে সচেষ্ট হওয়া। যারা বোরখা পরেন তাদের ভাবা দরকার আমার পর্দার যেন দিন দিন উন্নতি হয়। আমি তাকওয়ার আরও নিকটবর্তী হতে পারি। এজন্য মাঝে মধ্যে পর্দা বিষয়ক ইসলামের নির্দেশনাগুলো পড়া এবং নিজেকে যাচাই  করে নেওয়া যে, কোনো ক্ষেত্রে আমার মাঝে শিথিলতা আছে কিনা।

 

আল্লাহ সাজ-সজ্জা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু এমন হচ্ছে না তো যে, আমার বোরখাই এক প্রকার সাজ-সজ্জা ?বোরখা তো ‘যীনাত’ বা সাজ-সজ্জা ঢাকার জন্য। বিষয়টা অনেকেই খেয়াল করেন না। এরপর থাকল উপরের আকর্ষণ ও প্রদর্শন শিরোনামে যে আলোচনা করা হল এসব ক্ষেত্রে আমার অবস্থা কী? ইতিবাচক না নেতিবাচক? কারণ, বোরখা গ্রহণের পরও আকর্ষণ-প্রদর্শন হতে পারে,যদি আল্লাহর ভয়ে পর্দা না করি। মোদ্দাকথা, আমি বোরখা গ্রহণ করতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।আমি অনেকদূর অগ্রসর হতে পেরেছি। কিন্তু শুধুই বোরখা গ্রহণ করেছি নাকি আল্লাহ,আল্লাহর রাসূলের দেয়া পর্দার বিধান মন থেকে গ্রহণ করতে পেরেছি এবং আল্লাহর ভয়ে নিজ থেকেই তা পালন করছি- এটা ভেবে দেখা দরকার। তাহলে আমাকে আর খুটিয়ে খুটিয়ে এটা বলে দিতে হবে না যে, এটা কর, ওটা করো না। এটা পর্দার খেলাফ, ওটা করা যাবেনা। বরং আমি নিজে থেকেই বুঝতে পারব আমাকে কোনটা করতে হবে কোন্ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

 

সকল প্রতিকূল পরিবেশে পর্দার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের বোনদেরকে ঐ নারীর মত অবিচল থাকার তাওফীক দিন, যাকে এক বিদেশি সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল, ‘‘এই প্রচন্ড গ্রীষ্মের গরমে আপনি কীভাবে বোরকাবৃত থাকেন? আপনার কি গরম লাগে না? তরুণীটি এর উত্তরে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করলেন যার অর্থ,

‘বলে দিন, জাহান্নামের আগুন এর চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত।’

 

 

 

চলবে……………………

 

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*