কুসতুনতুনিয়া বিজয়ের কাহিনী

By | Tue 17 Safar 1444AH || 13-Sep-2022AD

আদিব হুজুরের (আবু তাহির মিসবাহ) চমৎকার লিখনিতে সুলতান মাহমুদ ফাতিহ রাহিঃ ইস্তাম্বুল শহর বিজয়ের ঐতিহাসিক কাহিনী যা প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক আল-কাউসারে এবং পরে উনার তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে নামক বইতে।


ঐতিহাসিক দিক থেকে ইস্তাম্বুল শহর, যার পূর্বনাম ছিলো কনস্টান্টিনোপল, এর এত বিরাট গুরুত্ব ছিলো যে, রোম ও এথেন্সের পরই ছিলো এর অবস্থান। পৃথিবীর আর কোন প্রাচীন শহর এর সমকক্ষ ছিলো না। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান হওয়ার কারণে ভৌগোলিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। কথিত আছে, ফ্রান্সের বহু যুদ্ধজয়ী ‘সেনাপতি সম্রাট’ নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছেন, সারা পৃথিবী যদি একটিমাত্র সাম্রাজ্য হয় তাহলে তার রাজধানী হিসাবে ইস্তাম্বুলই হবে সবচে’ উপযুক্ত শহর।

হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে এটি ছিলো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী। উন্নতির চরমোৎকর্ষের সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যই ছিলো সম্পদে সভ্যতায় পৃথিবীর সবচে’ বড় শক্তি। খৃস্টানজগতের পূর্বাঞ্চলীয় গীর্জারও প্রধান কেন্দ্র ছিলো এ শহর। সেন্ট ছুফিয়া গীর্জার কথা তো আগেই বলা হয়েছে।

তো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এ বিরাট গুরুত্বের কারণেই স্বয়ং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শহর অধিকার করার জন্য উম্মতকে উৎসাহ দান করেছেন। এমনকি তিনি মুসলমানদের হাতে এ শহর বিজিত হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন, আর যারা কুসতুনতুনিয়া বিজয়ের জিহাদে শরীক হবে তাদের জন্য মাগফেরাতের খোশখবর দিয়েছেন।

হযরত আনাস রা.-এর খালা হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. ছিলেন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘রাযাঈ’ (দুধশরীক)  আত্মীয়া। একদুপুরে তিনি তাঁর ঘরে বিশ্রাম করছিলেন; হঠাৎ তিনি জাগ্রত হলেন, আর তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে মৃদুহাসির উদ্ভাস দেখা দিলো।

হযরত উম্মে হারাম কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, স্বপ্নে আমাকে উম্মতের ঐসব লোকদের দেখানো হলো যারা জিহাদের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করবে। বড় বড় ঢেউয়ের উপর তাদের অবস্থা হবে এমন যেন সিংহাসনের উপর বসে আছেন বাদশাহ।

হযরত উম্মে হারাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, দু‘আ করুন, আমাকেও যেন আল্লাহ ঐ জিহাদে শামিল করেন।

তিনি দু‘আ করলেন, আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। একটু পর আবার জেগে ওঠলেন এবং তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল মৃদুহাসিতে উদ্ভাসিত হলো।

হযরত উম্মে হারাম আবার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, আর তিনি বললেন, আমার উম্মতের প্রথম লশকর যারা রোমের কায়ছার-এর শহর (কুসতুনতুনিয়া) জয় করার জন্য জিহাদ করবে তাদের মাগফেরাতের খোশখবর দেয়া হয়েছে।

হযরত উম্মে হারাম আবার আরয করলেন, হে আল্লাহর নবী, দু‘আ করুন, ঐ লশকরে আল্লাহ যেন আমাকেও শামিল করেন।

(সম্ভবত আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, না, তুমি শুধু প্রথম লশকরে শামিল হবে।)

হযরত উছমান রা.-এর খেলাফত -কালে তাঁর আদেশে হযরত মু‘আবিয়া রা. সাইপ্রাসে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিলো প্রথম নৌঅভিযান। হযরত উম্মে হারাম তাঁর স্বামী হযরত উবাদাহ বিন ছামিত রা.-এর সঙ্গে ঐ জিহাদে শামিল হয়েছিলেন। এ অভিযানেই সন্ধির মাধ্যমে সাইপ্রাস মুসলমানদের অধিকারে আসে। সুতরাং এদিক থেকে মুসলিম উম্মাহর প্রথম নৌঅভিযান ছিলো সফল। ফেরার পথে হযরত উম্মে হারাম ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে গিয়ে শাহাদাত লাভ করেন। এভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ পূর্ণতা লাভ করে।

পরবর্তীকালে হযরত মু‘আবিয়া রা.- যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন তিনি আপন পুত্র ইয়াযিদের নেতৃত্বে কুসতুনতুনিয়ায় অভিযান পরিচালনা করেন। উচ্চ মরতবার বহু ছাহাবী তাতে শামিল ছিলেন।    তাঁদেরই একজন ছিলেন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযবান হযরত আবু আইয়ূব আনছারী রা.।

এটা ছিলো ইসলামের ইতিহাসে কুসতুনতুনিয়ার প্রথম অবরোধ। দীর্ঘ দিনের কঠোর অবরোধের পরো শহরটি দখল করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা. অসুস্থ হয়ে পড়লেন, যা ছিলো তাঁর ‘মারাযুল মউত’। সেনাপতি ইয়াযীদ তাঁকে দেখতে এসে জানতে চাইলেন, ‘আপনার কোন ইচ্ছা, যা আমি পূর্ণ করতে পারি?!’

আল্লাহর নবীর মেযবান এই বৃদ্ধ ছাহাবী মৃত্যুশয্যায় যে শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন, এযুগের মুসলমানদের কল্পনায়ও হয়ত তা আসবে না। তিনি বললেন, ‘ভাতিজা, মউতের পর আমার জানাযা নিয়ে যতদূর পারো এগিয়ে যেয়ো। যখন আর এগুতে পারবে না তখন সেখানেই আমাকে দাফন করো।’

হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর তামান্না পূর্ণ করা হলো। মৃত্যুর পর তাঁর জানাযাসহ মুজাহিদীন আগে বাড়লেন এবং কুসতুনতুনিয়ার নগরপ্রাচীরের গোড়ায় তাঁকে দাফন করলেন।

কথিত আছে, শহরের বিশিষ্ট লোকদের ডেকে ইয়াযীদ বলেছিলেন, ‘দেখো, আমরা আমাদের সবচে’ বুযুর্গ ব্যক্তিকে তোমাদের যমীনে দাফন করে গেলাম। যদি এ কবরের সামান্য অবমাননাও করা হয় তাহলে আল্লাহর কসম, আমাদের ক্রোধ থেকে কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। এ শহর ধূলোর সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে।’

মুসলমানদের কথা তখন শুধু ‘শব্দ’ ছিলো না, ছিলো শক্তি; তলোয়ারের শক্তি, বারুদের শক্তি এবং কামানের শক্তি। যত দিন শব্দের পিছনে শক্তি ছিলো, কোন রাজা ও রাজ্যের সাধ্য ছিলো না তাকে অবজ্ঞা করার। যে বাহিনী শহর জয় করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছে, তার সেনাপতির এ ধমককে অবজ্ঞা করার সাহস হয়নি কনস্টান্টিনোপলের নগরপতির, এমনকি স্বয়ং বাইজান্টাইন সম্রাটের।

এভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও পূর্ণ হলো।

এরপর ছিলো তৃতীয় সুসংবাদ এবং সেটাই ছিলো চূড়ান্ত সুসংবাদ। মুসনাদে আহমদে হযরত বিশর বিন সোহায়ম রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لتفتحن القسطنطنـيـة, فلنعم الأمير أميرها, ولنعم الجيش ذلك الجيش

‘অবশ্যই তোমরা কুসতুনতুনিয়া জয় করবে। তো কত না উত্তম সেই আমীর এবং কত না উত্তম সেই বাহিনী!

এ সুসংবাদ তো সাধারণ কোন সুসংবাদ ছিলো না। পরবর্তী যুগের প্রত্যেক মুসলিম শাসকের অন্তরেই ছিলো এ মহান সুসংবাদের গৌরব অর্জনের আকাক্সক্ষা, এমনকি আদর্শ খলিফা হযরত ওমার বিন আব্দুল আযীয রহ.ও তাঁর সংক্ষিপ্ত খেলাফত-কালে একবার চেষ্টা করেছেন। উমাইয়া খলীফাদের মধ্যে ছিলেন হিশাম বিন আব্দুল মালিক। আরো পরে আব্বাসী খলীফাদের মধ্যে ছিলেন আলমাহদী ও হারুনুর-রশীদ, যার সম্পর্কে ইতিহাস বলে, একবছর তিনি হজ্বের সফর করতেন, আরেক বছর করতেন জিহাদের সফর।

একের পর এক অভিযান চলছিলো, কিন্তু প্রতিটি অভিযান এসে আছড়ে পড়তো কুসতুনতুনিয়ার নগরপ্রাচীরের গায়ে। কোন অভিযানই সফল হতে পারেনি।

আল্লামা তক্বী উছমানী তাঁর সফরনামায় এসম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করে লিখেছেন-

‘প্রথমত শহরটির অবস্থানই ছিলো এমন যে, তিনদিকেই ছিলো উপসাগরীয় বেষ্টনী, যা শহরটিকে অজেয় করে রেখেছিলো। দ্বিতীয়ত এটা ছিলো এমন পাহাড়ী এলাকা যেখানে শীতকালে শীতের প্রকোপ ছিলো ভয়াবহ। আরবের মরুবাসীদের জন্য ঐ শীতের মোকাবেলা করা ছিলো কঠিন, বরং অসম্ভব।

তৃতীয়ত শহরের চারপাশে পরপর তিনটি প্রাচীর ছিলো। প্রতি একশ সত্তর ফুট দূরত্বে ছিলো মযবূত বুরুজ, যেখানে রাতদিন ছিলো চৌকশ প্রহরীদলের সতর্ক প্রহরা। প্রতিটি প্রাচীর ছিলো অতি সুদৃঢ়। প্রথম দুই প্রাচীরের মাঝখানে ছিলো ষাট ফুট প্রশস্ত এবং একশ’ ফুট গভীর একটি পরিখা। এদিক থেকে এই নগর-দুর্গ ছিলো তদানীন্তন পৃথিবীতে সবচে’ সুরক্ষিত ও অপরাজেয়।

চতুর্থত ঈসায়ী দুনিয়ায় কুসতুনতুনিয়ার যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদা ছিলো তার প্রেক্ষিতে প্রতিটি হামলার সময় পুরো ঈসায়ী দুনিয়া একযোগে এগিয়ে আসতো এবং জানের বাজি লাগিয়ে দিতে একেবারে তৈয়ার হয়ে যেতো।’

আমার মতে আরেকটি কারণ ছিলো যা আল্লাহর ইচ্ছায় সুলতান মুহাম্মাদ আলফাতিহ সর্বপ্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। সে প্রসঙ্গ পরে আসছে।

***

সেলজুকী তুর্কীদের পতনের পর উছমানী সালতানাত গড়ে উঠলো। পঞ্চম উছমানী সুলতান বায়যীদ ইয়লদরম (১৩৮৯ – ১৪০২ খৃ.) তাঁর ক্ষমতার শেষ বছর পূর্ণ শক্তি নিয়ে কুসতুনতুনিয়া অবরোধ করেছিলেন। বীরত্ব ও যুদ্ধকুশলতায় তিনি ছিলেন তার যুগের সেরা শাসক। ইউরোপের জন্য মূর্তিমান ত্রাস, যেন আকাশের বজ্র। তাই তার উপাধি ছিলো ইয়লদরম (বজ্র)।[1]

সমরকুশলতা ও সামরিক প্রস্তুতি উভয়দিক থেকেই যথেষ্ট সম্ভাবনাপূর্ণ ছিলো কুসতুনতুনিয়ার উপর ‘ইয়লদরম’-এর ‘বজ্রাঘাত’। এবং ঐতিহাসিকদের মতে অবরোধের গতিপ্রকৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছিলো শহরটির পতন ছিলো সময়ের ব্যাপার।

কিন্তু সুলতান বায়যীদ ইয়লদরম-এর দুর্ভাগ্য, তার চেয়ে বেশী পুরো মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য যে, সুলতানকে অবরোধ তুলে আঙ্কারায় ফিরে আসতে হলো। কারণ ‘ল্যাঙড়া’ তৈমূর সেটাকেই ভেবে বসলেন মোক্ষম সময় পিছন থেকে সুলতানের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়ার। হাঁ, তৈমুরের হামলা ছিলো পিছন থেকে ছুরি বসিয়ে দেয়ারই মত, যা কোন মুসলিম শাসকের পক্ষে তো বটেই, কোন অভিজাত বীরের পক্ষেও ছিলো লজ্জার বিষয়। এমনকি ক্রুশেডযুদ্ধের বীর রাজা রিচার্ড, যাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজ ঐতিহাসিকরা ‘সিংহহৃদয়’ বলে থাকে, তিনিও বাইতুল মাকদিসবিজয়ী সুলতান ছালাহুদ্দীনের উপর এমন কাপুরুষোচিত হামলা কখনো করেননি।

রাজধানী আঙ্কারার কাছে ঘোরতর যুদ্ধ হলো তৈমুর লঙ ও সুলতানের বাহিনীর মধ্যে। সুলতানের বাহিনী তখন খৃস্টানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অবরোধ লড়াইয়ের কারণে ছিলো ক্লান্ত, শ্রান্ত ও বিপর্যস্ত। তৈমূরের মত একটি তাজাদম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অবস্থায় কোনভাবেই ছিলো না। ফল যা হওয়ার তাই হলো। সুলতান বায়যীদ, ইউরোপ যাকে মনে করতো ‘ইয়লদরম’, মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হলেন এবং বন্দী হলেন। বন্দী বীরের যে মর্যাদা প্রাপ্য ছিলো তাও দিতে রাজী হয়নি ল্যাঙড়া তৈমূর।

যাক, এটা ছিলো মুসলিম উম্মাহর এক ‘ট্রাজেডি’, যার কারণে কুসতুনতুনিয়ার বিজয় দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে গিয়েছিলো। শুধু এই একটি কারণে চেঙ্গিজ যদিও বা মুসলিম উম্মাহর ক্ষমা পেয়ে যায়, তৈমূর কখনো ক্ষমা পেতে পারে না।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা উছমানী সালতানাতের অষ্টম সুলতান মুহাম্মাদ-এর হাতে কুসতুনতুনিয়ার বিজয় সম্পন্ন করলেন। মাত্র বাইশবছর বয়সে এই সাহসী যুবক সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কুসতুনতুনিয়া জয় করার সুবাদেই তিনি ‘আলফাতিহ’-এর মর্যাদাপূর্ণ উপাধি লাভ করেছিলেন তাঁর সালতানাতের  আলিমদের পক্ষ হতে। সর্বোপরি তিনিই হলেন, যবানে নবুয়ত থেকে উচ্চারিত نعم الأمير  (কত না উত্তম আমীর!)

যুবক বয়সেই তিনি যেমন ছিলেন সৎ, ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ তেমনি ছিলেন সাহসী, সমরকুশলী এবং অতুলনীয় প্রজ্ঞার অধিকারী।

প্রথমেই তিনি চিন্তা করে ঐসব কারণ চিহ্নিত করলেন যা এতদিন কনস্টান্টিনোপল জয়ের পথে বাঁধা হয়ে এসেছে।

ইউরোপ থেকে কনস্টান্টিনোপলের জন্য যে সামরিক সাহায্য আসতো তা সাধারণত কৃষ্ণসাগর থেকে বসফরাস উপসাগর হয়ে স্বর্ণশৃঙ্গের মাঝামাঝিতে অবস্থিত বন্দরে এসে ভিড়তো। সুতরাং শহরটিকে ইউরোপীয় সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছিলো জরুরি। আর সে জন্য বসফরাসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কোন বিকল্প ছিলো না। হতভাগ্য সুলতান বায়যীদও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। সে জন্য তিনি বসফরাসের সবচে’ সঙ্কীর্ণ এলাকাটি চি‎হ্নিত করে তার এশীয় অংশে একটি মযবূত দুর্গ তৈরী করেছিলেন, যা আনাতোল দুর্গ নামে প্রসিদ্ধ। ইয়লদরমের জিহাদি প্রচেষ্টার স্মারক হিসাবে দুর্গটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

এ পর্যন্ত ঠিক ছিলো, কিন্তু সুলতান মুহাম্মাদ দেখলেন, বসফরাসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু একপাড়ের দুর্গ যথেষ্ট নয়। তাই তিনি ঐ দুর্গ বরাবর ইউরোপীয় অংশেও একই রকম মযবূত একটি দুর্গ তৈরী করলেন, রোমেল দুর্গ। দূর থেকে উপসাগরের মাঝখানে জাহাযে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়, দুই সহযোদ্ধা  বুঝি বসফরাসকে পাহারা দিচ্ছে। জনৈক ইউরোপীয় পর্যটক এভাবেই বর্ণনা করেছেন, আমি হলে ‘সহযোদ্ধা’র পরিবর্তে লিখতাম, ‘দুই মুজাহিদ সহোদর’।

ফল এই দাঁড়ালো যে, আনাতোল দুর্গের তোপের নাগাল এড়িয়ে ইউরোপীয় তীর ঘেঁষে যেসব জাহায নিরাপদে পার হয়ে যেতো তারা আর নিরাপদ থাকলো না। প্রতিটি জাহায উছমানীদের দোতরফা তোপের নাগালে এসে গেলো। ইউরোপের ঐতিহাসিকগণপর্যন্ত সুলতান মুহাম্মাদ-এর এ বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বিদ্বেষটুকু লুকিয়ে রাখতে না পেরে লিখেছেন, ‘যথেষ্ট দুষ্টু বুদ্ধি ছিলো তাঁর মাথায়’!

জ্বি হাঁ, বাড়া ভাতে ছাই পড়েছিলো যে!

সুলতান আরেকটি বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। তিনি দেখলেন, বর্তমান তোপগুলো নগরপ্রাচীরে কার্যকর আঘাত হানার জন্য তেমন উপযোগী নয়। তাই তিনি লোহার পরিবর্তে পিতল ব্যবহার করে এমন বিশাল এক কামান তৈরী করলেন যার সমকক্ষ কামান সারা দুনিয়ায় তখন ছিলো না। ঐ তোপ থেকে যখন পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম গোলাটি নিক্ষেপ করা হলো তখন কনস্টান্টিনোপল শহর পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো। বলা হয়, সুলতান ইচ্ছাকৃতভাবেই শহরের কাছাকাছি এলাকায় পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন। শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার জন্যই ছিলো তাঁর এ কুশলী পদক্ষেপ। তাতে এক ঢিলে দুই পাখী শিকার হলো। পরীক্ষাও হলো, শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়াও হলো। সাধে কি আর ইউরোপের ঐতিহাসিক ‘দুষ্ট বুদ্ধি’ কথাটা ব্যবহার করেছেন!

ঐ তোপ থেকে আটমন ওজনের গোলা একমাইলেরও বেশী দূরত্বে নিক্ষেপ করা যেতো। বারুদবোঝাই করতে সময় লাগতো দু’ঘণ্টা; তবে অবরোধের একপর্যায়ে আরো কম সময়ে বারুদবোঝাই হতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

সুলতান মুহাম্মাদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আনলেন। কনস্টান্টিনোপল যেহেতু তিনদিক থেকে বসফরাস, মারমারা প্রণালী এবং গোল্ডেন হর্ন দ্বারা বেষ্টিত ছিলো, শুধু পূর্বদিকে ছিলো স্থল। সুতরাং কার্যকর হামলার জন্য তিনদিকের জলভাগকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া ছিলো জরুরি। তাই তিনি একশ’ চল্লিশটি জঙ্গীজাহাযের এক বিশাল বহর গড়ে তুললেন সম্ভাব্য কম সময়ের মধ্যে।

এভাবে যুবক সুলতান তাঁর সাধ্যের ভিতরে সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে কনস্টান্টিনোপল আবরোধ করলেন। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বাইজান্টাইন সম্রাট জানতেন, সুলতান শহর অবরোধ করবেন, তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য সুলতানের যতটা সময় প্রয়োজন বলে তিনি ভেবেছিলেন তার চেয়ে অনেক কমসময়ে সুলতান তাঁর আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। সম্রাটের ধারণা থেকে সুলতান প্রায় একবছর এগিয়ে ছিলেন।

অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছেন, সময়কেও সুলতান একটি কার্যকর অস্ত্ররূপে ব্যবহার করেছেন, যদি এযুগের ভাষায় বলি, ‘সময়-বোমা’, খুব একটা বেমানান হবে না আশা করি।

বিষয়টি বোঝার জন্য এ তথ্যটি খুবই উপযোগী হবে যে, আনতোল দুর্গের বরাবর ইউরোপীয় অংশে সুলতান যে দুর্গটি তৈরী করেছেন তাতে সময় লেগেছে মাত্র এবং মাত্র চারমাস চারদিন; আবার পড়ুন, চারমাস চারদিন! ১৪৫২ সালের ২৪শে এপ্রিলে শুরু হয়ে ২৮শে আগস্ট সমাপ্ত হয়েছে।

দুর্গের নকশা তৈরী করেছিলেন সুলতানের প্রধান প্রকৌশলী মুছলেহুদ্দীন আগা, যিনি কোরআনের হাফেয ছিলেন এবং আলেম ছিলেন।[2] দুর্গটি গড়ে উঠেছে তিনহাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে, যার বুরুজ সংখ্যা হলো ১৭টি। কয়েকটি বুরুজের উচ্চতা নব্বই ফুটের মত। কোন কোন স্থানে পাচিলের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার।

আবার ভাবুন, এমন একটি দুর্গ তৈরী হয়েছে মাত্র চারমাস চারদিন সময়ের মধ্যে। সন্দেহ হতেই পারে, ‘সোলায়মানের দৈত্য হয়ত এখানে কাজ করেছে।’

আল্লামা উছমানী মু. ঠিকই লিখেছেন-

‘আজ স্থাপত্যবিদ্যা কত উন্নতি করেছে তা তো জানাই আছে। কিন্তু এমন একটি দুর্গের শুধু নকশাই হয়ত এখন চারমাসে প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না।’

মঞ্চের পিছনের পর্দায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেখানো হলো কীভাবে রোমেল দুর্গ তৈরী হচ্ছে। শ্রমিকরা কাজ করছে আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছে। অপূর্ব! সত্যি অপূর্ব!!

যাই হোক, সুলতান তুফানের গতিতে প্রস্তুতি নিয়ে ঝড়ের বেগে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করলেন, আর তখনই তাঁর সামনে দেখা দিলো এমন একটি সমস্যা যা মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর মত দূরদর্শী সুলতানেরও চিন্তায় আসেনি।

স্থলপথে ফৌজ শহরের পূর্বপ্রাচীর ও তার দরজা অবরোধ করলো, অন্যদিকে নৌবহর বসফরাসের বুকে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু আসল প্রয়োজন ছিলো গোল্ডেন হর্ন-এ অবস্থিত বন্দরটি অবরোধ করা এবং আরো এগিয়ে দক্ষিণদিকের প্রাচীরকে তোপের নাগালে নিয়ে আসা। কিন্তু …

এই কিন্তুটার জন্য বাইজান্টাইন সম্রাটকেও সাধুবাদ দিতে হয়। আসলে তিনি সাহসী ও কুশলী দু’টোই ছিলেন; তবে কিনা পাল্লাটা পড়ে গিয়েছিলো মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর সঙ্গে!

কনস্টান্টিনোপলের অবস্থান ছিলো এমন যে, বসফরাস থেকে একটি চিকন শাখা শিঙ-এর মত বের হয়ে পূর্বদিকে চলে গিয়েছে, যাকে ইংরেজিতে বলে গোল্ডেন হর্ন।[3] 

এই ‘স্বর্ণশৃঙ্গের মাঝামাঝি অংশেই কনস্টান্টিনোপলের ‘প্রাণভোমরা’-রূপে গণ্য বন্দর অবস্থিত ছিলো।

এখানে পৌঁছতে হলে বসফরাস থেকে স্বর্ণশৃঙ্গে প্রবেশ করতে হবে। আর স্বর্ণশৃঙের ঠিক প্রবেশমুখে বাইজান্টাইন সম্রাট একটি ‘কিন্তু’ তৈরী করে রেখেছিলেন। সেটা হলো এপার থেকে ওপার পর্যন্ত পানির উপর টানিয়ে রাখা লোহার মস্ত বড় যিঞ্জির। এমনিতে উপর থেকে দেখা যায় না, কিন্তু জাহায যেতে নিলেই বাধাগ্রস্ত হয়, এমনকি ডুবেও যায়। ভাবুন, কত বড় ‘কিন্তু’ যা সুলতানের ভাবনায় আগে আসেনি।

গোল্ডেন হর্ন-এর ভেতরের দিকে বড় বড় বাইজাইন্টীয় জাহায যিঞ্জিরের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত ছিলো, আবার উভয় তীরে পর্যাপ্ত সংখ্যক তোপ স্থাপন করা হয়েছিলো। মোটকথা, সুলতানের কোন জাহাজের জন্য স্বর্ণশৃঙ্গে প্রবেশ করার চেষ্টা করার অর্থই ছিলো মৃত্যুফাঁদে পা দেয়া।

আমার মনে একটি প্রশ্ন ছিলো, বাইজান্টাইন জাহায এবং ইউরোপ থেকে সাহায্য নিয়ে আসা জাহায তাহলে বন্দরে যেতো কীভাবে?

মঞ্চের পিছনের পর্দায় ‘ছায়াছবি’ দেখানোর সময় নেপথ্যে কণ্ঠদানকারী এর জবাব দিয়েছেন যে, নিজেদের প্রয়োজনের সময় শেকলে ঢিল দেয়ার ব্যবস্থা ছিলো। প্রয়োজনে ঢিল দেয়া হতো, আবার টান করে আগের অবস্থায় নিয়ে আসা হতো। পর্দায় সেটা করেও দেখানো হলো। বলতেই হয়, ‘বুদ্ধিতে অতি বড় পাকা সে’!

***

মুহাম্মাদ আলফাতিহকে আল্লাহ তা‘আলা তেমন সাহস ও প্রজ্ঞাই দান করেছিলেন। খুব দ্রæত চিন্তা করে তিনি এক অবিশ্বাস্য উপায় বের করলেন। তাঁর নৌবহরে একশ’ চল্লিশটি জাহায তো ছিলোই। কিন্তু সেগুলো ছিলো বড় ও ভারী জাহায। তিনি গুণে গুণে ছোট আকারের হালকা সত্তরটি জাহাজ তৈরী করার আদেশ দিলেন, আর বললেন, সময় কম, ঠিক বিশদিনের মাথায় সত্তরটি জাহায প্রস্তুত চাই। জাহাজের নকশা তৈরী করার দায়িত্ব যাকে দিলেন তাকে শুধু উদ্দেশ্যটির আংশিক জানালেন, আর বললেন, ‘যদি তৃতীয় কেউ জানতে পারে, বিশ্বাস করো বন্ধু, তোমার কল্লাটা এককোপে আলাদা করে ফেলবো।’

যিনি বলেছেন সত্য বলেছেন, ‘শাসককে শুধু কোমলহৃদয় হলে চলে না, পাষাণহৃদয়ও হতে হয়।’

সুলতানের চারপাশে তেমন মানুষই আল্লাহ জড়ো করেছিলেন, পালাক্রমে দিনরাত কাজ করে আঠারো দিনের মাথায় সুলতানকে তারা জানালো, ‘জাহায তৈয়ার’!

এরপর সুলতান কী করবেন? ঠিক এ প্রশ্নটাই করেছিলেন সুলতানের উযীর। সুলতান শীতল দৃষ্টিতে উযীরের দিকে তাকালেন, আর নিজের দাড়ীর একটি চুল ধরে বললেন, ‘আমার এই দাড়িটি যদি তা জেনে ফেলতো, একটানে উপড়ে ফেলতাম।’

বলাবাহুল্য, উযীর এরপর সভয়ে সুলতানের সামনে থেকে সরে গিয়েছিলেন।

এমন কঠোর গোপনীয়তারও প্রয়োজন পড়ে। গোপনীয়তার অর্থ তোমাকে অবিশ্বাস করা নয়; গোপনীয়তার অর্থ সতর্কতা। যার যেটা জানার প্রয়োজন নেই তার সেটা জানতে চাওয়া বোকামি, আর তাকে সেটা জানানো নির্বুদ্ধিতা। উযীর বোকামি করেছেন, সুলতান নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেননি। কারণ আল্লাহ তাঁকে কুসতুনতুনিয়া জয় করার জন্য নির্বাচন করেছিলেন, আর আল্লাহর নবী ঐ বিজয়ীকে উত্তম আমীর বলে সুসংবাদ দিয়ে গিয়েছিলেন।

সুলতান আগেই আদেশ দিয়েছিলেন প্রচুর পরিমাণে লম্বা ও গোলাকার গাছের গুঁড়ি কেটে প্রস্তুত করার জন্য। তাই সেগুলো যথাসময়ে তৈয়ার ছিলো। সুলতান আলকাতরা ও চর্বি দিয়ে সেগুলো পিচ্ছিল করার আদেশ দিলেন। এবার রাতের অন্ধকারে মশালের আলোতে শুরু হলো আসল কাজ।

ছায়াছবিতে সে দৃশ্যই দেখানো হচ্ছিলো, আর আমরা রুদ্ধশ্বাসে দেখছিলাম। যেন দূর অতীতের কোন ইতিহাস নয়, আমাদেরই চোখের সামনে জীবন্ত অবস্থায় ঘটছে সবকিছু! একটি করে জাহায বসফরাসের পানি থেকে উপরে উঠছে, আর গাছের পিচ্ছিল গুঁড়িগুলোর উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের যুগ তো হলো বিজ্ঞানকল্পকাহিনীর যুগ, অবিশ্বাস্য থেকে অবিশ্বাস্য ঘটনাকেও মনে হয় সত্য ও বাস্তব। কিন্তু এ যেন এ যুগের ‘সাইন্স ফিকশন’কেও হার মানায়!

চোখের সামনে দেখতে পেলাম লাইন ধরে সত্তরটি জাহাজ বসফরাসের পানি থেকে গায়েব হয়ে গেলো। মশালের আলোতে অস্পষ্ট দেখা যায় জাহাজের লাইন মাটির উপর যেন ‘ভেসে’ চলেছে। ঘরঘর আওয়ায ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। ইতিহাসে আছে, বাইজান্টাইন ফৌজ নগরপ্রাচীরের উপর থেকে শুধু মশালের আলোর ছোটাছুটি দেখতে পাচ্ছিলো, আর ঘরঘর আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলো, কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। কথিত আছে, খবর পেয়ে সম্রাট নিজেও নগরপ্রাচীরের উপরে উঠে বুঝতে চেষ্টা করলেন, ‘কি করছেন ওখানে রাতের আঁধারে আমার অর্ধেক বয়সের সুলতান ‘মোহামেড’?!’ কিন্তু বুঝতে পারেননি। বেচারার আর দোষ কী, কল্পনায় আসার মত ঘটনা হতে হবে তো! 

বসফরাসের পশ্চিম তীর থেকে জাহায স্থলে উঠেছে, আর আঁকা-বাঁকা পথ হয়ে স্বর্ণশৃঙ্গের উপরের দিকে দক্ষিণকিনারে গিয়ে নেমেছে। সে দৃশ্যও ছিলো বড় রোমাঞ্চকর। এখন যে লিখছি, দেহমনে এমন রোমাঞ্চ সৃষ্টি হচ্ছে যে, বারবার লেখা থামিয়ে আচ্ছন্ন বসে থাকি, আর ভাবি, কেমন হিম্মত দিয়েছিলেন এই মরদে মুমিনের দিলে আল্লাহ! শোকরে কৃতজ্ঞতায় একবার তো হৃদয় এমনই আপ্লুত হলো যে, কলমটা রেখে উঠে গিয়ে দু’রাকাত নামায পড়ে সুলতান আলফাতিহ-এর মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করলাম।  

দীর্ঘ দশমাইল পথ পাড়ি দিয়ে সত্তরটি জাহাজ লাইন ধরে একটু পরপর স্বর্ণশৃঙ্গের পানিতে গিয়ে নামলো। পুরো দৃশ্যটা পর্দায় এমন জীবন্ত ছিলো যেন আমি সেই যুগের মানুষ, আমারই চোখের সামনে ঘটছে পুরো ঘটনা!

পানিতে একটি করে জাহাজ নামে, আর বহু কণ্ঠের তাকবীর- ধ্বনি শোনা যায়। সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত মেহমান ও হাজার হাজার দর্শক এমন জোশে এসে যায় যে, তারাও তাকবীর ধ্বনি করে ওঠে। আসলে ইতিহাসের পাতায় যা পড়েছি তা যেমন বুঝতে পারিনি, সেদিন ইস্তাম্বুলে ঐ সম্মেলনকক্ষে পর্দায় ছবির আকারে যা দেখেছি তাও এখন কলমের ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারছি না।  শুধু বলতে চাই, হে মুহাম্মাদ আলফাতিহ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। এ যুগের তুর্কী মায়েরা যেন তোমার মত শিশুকে স্তন্য দান করতে পারে। তুর্কিস্তান আবার যেন ফিরে আসে আমাদের হাতে নতুন কোন ‘আলফাতিহ’-এর হাত ধরে, আমীন।

এরপর স্বর্ণশৃঙ্গের কাছে যে বাইজান্টাইন জাহাযগুলো ছিলো,ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে তারা জেনে গেলো,রাতের আঁধারে কী সর্বনাশ ঘটে গেছে! ছোট ছোট সত্তরটি জাহাজ যেন নয়,জ্যান্ত সত্তরটি দৈত্ত-শাবক যেন তাদের দিকে মুখ হা করে চেয়ে আছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে হুশ সামলে কামান দাগাতে দাগাতে প্রায় অর্ধশত বৃহদাকার জাহায ছুটে এলো। ইতিহাসের সেরা একটি নৌযুদ্ধ স্বর্ণশৃঙ্গের অল্পপরিসর স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। সুলতানের জাহাযগুলো আকারে ছোট হওয়ার কারণে কম গভীরতার পানিতে স্বচ্ছন্দ্যে ছোটাছুটি করছে,পক্ষান্তরে বাইজান্টাইন জাহায আকারে ছিলো এত বড়, যেন ‘হাতি পড়েছে হাঁটুজল খালেতে’। ফলে  সেগুলো সুবিধামত নড়াচড়াই করতে পারছিলো না। অল্প সময়ের মধ্যে শত্রুপক্ষের কয়েকটি জাহায ডুবে গেলো। ডুবে গেলো মানে, রীতিমত ‘সলিল সমাধি’ লাভ করলো। তবে ইতিহাসের কোন নৌযুদ্ধে কোন বিজয়ীপক্ষ যা করেনি সুলতান মুহাম্মদ আলফাতিহ তাই করলেন। আফসোস, ইউরোপের সব ঐতিহাসিক আলফাতিহ-এর এমন একটি মহানুভবতার কথা এখনো পর্যন্ত চেপেই রেখেছে। আশ্চর্য! কৃতজ্ঞতা নামে কোন কিছু কি নেই ইউরোপের চরিত্রে!  সে এক অভাবনীয় দৃশ্য! উছমানিদের ছোঁড়া আগুনের গোলার আঘাতে জ্বলতে থাকা বাইজান্টাইন জাহাযগুলো তাদের ডুবন্ত নৌসেনাদের কোন পরোয়া না করে পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে। ‘পালিয়ে যাচ্ছে’ কথাটা ইচ্ছে করেই বললাম না পরাজিত শত্রুর মানরক্ষার জন্য, কিংবা বলুন মনরক্ষার জন্য। এদিকে শত শত সৈন্য হাবুডুবু খাচ্ছে, আর প্রাণরক্ষার জন্য শত্রুরই কাছে আকুতি জানাচ্ছে। মুহাম্মদ আলফাতিহ কী করলেন? তার আগে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম, বাইজান্টাইন সম্রাট কনস্টান্টাইন কী করতেন? এর জবাব অবশ্য লেখা আছে, বাইতুল মাকদিসের ইতিহাসে, স্পেনের ইতিহাসে; লেখা আছে আধুনিক যুগের বসোনিয়া হার্জেগোভিনার রক্তাক্ত মানচিত্রে। আমি কিছু বলবো না, আপনি ইতিহাস পড়–ন।

এবার শুনুন, মুহাম্মদ আলফাতিহ কী করলেন? তিনি তাই করলেন যা করেছিলেন আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক গাজী ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী বাইতুল মাকদিস বিজয়ের পর, সেই পরাজিত ক্রুসেডারদের সঙ্গে, সেখানকার পবিত্র ভ‚মিতে যারা মুসলিমরক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো। মুহাম্মদ আলফাতিহ আদেশ দিলেন প্রতিটি ডুবন্ত সৈন্যকে যেন উদ্ধার করা হয়। পানিতে রশি ফেলা হচ্ছে। যার সামনেই রশি পড়ছে, আকড়ে ধরছে। কখনো একজন, কখনো দু’জন। দু’জনকে টেনে তুলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে, তবু আলফাতিহ-এর বিজয়ী সৈনিকরা তাদের টেনে টেনে তুলছে জাহাযে। কোন কোন রশি আকড়ে ধরেছে তিনজন, চারজন। তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। উপর থেকে হয়ত বলা হচ্ছে, একজন ধরো, তাহলে আমরা উদ্ধার করতে পারবো। তখন একজন আরেকজনকে হিংস্রভাবে আঘাত করে রশিটা নিজের দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। এই উদ্ধারপ্রচেষ্টার মধ্যেও কিছু সৈন্য প্রাণরক্ষার আকুতি জানাতে জানাতেই পানিতে ডুবে গেলো। বড় মর্মান্তিক দৃশ্য। হোক না শত্রু, মানুষ তো! এবং ডুবন্ত মানুষ!! যাই হোক, অল্পক্ষণেই ময়দান সাফ। ভুল বললাম, অল্পক্ষণেই সাগর সাফ! উছমানী নৌবহর স্বর্ণশৃঙ্গের সমগ্র এলাকায় পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে বন্দর অবরোধ করলো এবং সুলতান মুহাম্মদ আলফাতিহ শহরের দক্ষিণ প্রাচীরের উপর হামলার আয়োজন পূর্ণ করলেন।

সুলতান আরেকটি সময়োপযোগী কাজ করলেন। স্বর্ণশৃঙ্গে ভাসমান পোল তৈরী করে তাতে হালকা কিছু তোপ স্থাপন করলেন।

এবার শুরু হলো পূর্ব ও দক্ষিণ উভয়দিক থেকে একযোগে বড় বড় তোপের গোলাবর্ষণ। ওরে আল্লা! একটা করে গোলা এসে পড়ে, আর পুরো শহর কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা নিয়ে! এখানে ওখানে আগুন জ্বলে ওঠে এবং জ্বলতে থাকে। লাশ পড়ে এবং পুড়তে থাকে। কিন্তু আশ্চর্য! এমন কঠিন হামলার পরো প্রায় শহরের পাচিল স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকলো, সামান্য কিছু ফাটল ছাড়া তেমন কোন ক্ষতি হলো না। সুলতান নিজেও অবাক শহর-পাচিলের মযবূতি দেখে। সুলতান এবার নিজের তৈরী প্রিয় তোপটির কাছে গেলেন। আটমন ওজনের গোলা ভরার কাজে নিজেও শরীক হলেন। তারপর বিসমিল্লাহ বলে নিজের হাতে গোলার সলিতায় আগুন ছোঁয়ালেন। সামান্য সময় ঝড়পূর্ব শান্ত নীরবতার মত কেটে গেলো। সুলতান মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন, আল্লাহর কাছে তখন তিনি কী দু’আ করছেন তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কাছে যারা ছিলো তারা শুধু দেখলো, ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে চোখ থেকে। হঠাৎ তোপের গোলা ছুটে গেলো, যেন জাহান্নামের গহ্বর থেকে বের হয়ে আসা আগুন।  প্রাচীরের গায়ে বিরাট ফাটল তৈরী হয়ে গেছে! সবাই বুঝলো, এটা সুলতানের কারামাত ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তা’আলা সুলতানের দু’আর লাজ রক্ষা করেছেন।

গোলাবর্ষণ চলছে, লাগাতার নয়, কিছুটা বিরতি দিয়ে দিয়ে। অন্যান্য তোপের গোলায় শুধু আগুন জ্বলে, আর বড় তোপের গোলায় প্রাচীর-গাত্রে ফাটল সৃষ্টি হয়। কিছু কিছু শত্রুগোলা এদিকেও এসে পড়ছে, আর অবরোধকারী মুজাহিদদের তাঁবুতে এখানে ওখানে আগুন জ্বলে উঠছে। আগুন লাগামাত্র রশি কেটে তাঁবুগুলো ফেলে দেয়া হয়, তাই আগুন ছড়াতে পারে না।

আমাদের যুগে কামান থেকে গোলাবর্ষণের দৃশ্য দেখেছি, বাস্তবে এবং ছবিতে। কিন্তু সুলতানের কামান তো কামান নয়, রীতিমত ‘তোপ’, যেন আস্ত এক হাতি। যখন গোলা বর্ষণ করে, আজকের কামানের মত দ্রিম দ্রিম আওয়ায হয় না, যা হয় সেটা বোঝাতে দ-এর পরিবর্তে দরকার ‘ধ’ এবং একটা নয় একসঙ্গে কয়েকটা। উর্দুভাষার ‘ধামাকা’ শব্দটা এখানে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাভাষার নিরীহ ‘বিস্ফোরণ’ শব্দটি এখানে একেবারে অচল।  শহরের ভিতরেও গিয়ে পড়ছে কিছু গোলা। বড় বড় ইমারতে আগুন লেগে যেন কেয়ামতের প্রলয় সৃষ্টি করছে। দৃশ্যের ভয়াবহতায় আমাদেরও যেন বুক কেঁপে উঠছে।

ঐতিহাসিক গীবন লিখেছেন-

‘যে প্রাচীর বহু শতাব্দী ধরে বড় বড় শত্রুর প্রচণ্ড থেকে প্রচণ্ড হামলার মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো, উছমানী তোপের গোলা তার চেহারাটাই যেন বিগড়ে দিলো। স্থানে স্থানে বড় বড় ফাটল ধরে গেলো। সেন্ট রোমানূস-এর দরজার নিকটবর্তী চারচারটি মিনার মটির সঙ্গে মিশে গেলো।’

গীবন যা লেখেননি তা হচ্ছে, বিজয়ের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ানো মুসলিম ফৌজের গগনবিদারী তাকবীরধ্বনি।  ৮৭৫ হিজরী ১৫ই জুমাদাল উলা, মোতাবেক ২৪শে মে ১৪১৫ খৃ. সকালে এশরাকের পর সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ সম্রাট কনস্টান্টাইন-এর কাছে পয়গাম পাঠালেন, ‘দেখতেই পাচ্ছো, আমার তোপের আঘাতে তোমার নগরপ্রাচীর কীভাবে ভেঙ্গে পড়ছে! এ প্রাচীর হাজার বছর তোমাকে রক্ষা করেছে, কিন্তু আমার তোপের গোলা থেকে আর কয়েক ঘণ্টাও তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না।

আমি অযথা জানমালের ক্ষতি চাই না, না তোমার না আমার। এখনো সময় আছে, হাতিয়ার ফেলে দাও। তোমার ও প্রজাদের জানমাল, আবরু নিরাপদ থাকবে। তদুপরি ‘মূরিয়া’ অঞ্চল পুরোটাই তোমাকে দিয়ে দেয়া হবে।’

কিন্তু সুলতানের এমন উদার ও মহানুভবতাপূর্ণ প্রস্তাবের মর্যাদা সম্রাট কনস্টান্টাইন রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন।

সন্ধিপ্রস্তাবের জবাবে সম্রাট কনস্টান্টাইনের প্রেরিত বার্তাটি ছিলো এই-

‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, সুলতান সন্ধির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমি জিযিয়া দিয়ে সন্ধি করতে প্রস্তুত আছি; তবে ঈশ্বরের শপথ, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমি কনস্টান্টিনোপলের জন্য যুদ্ধ করবো। হয় আমার সিংহাসন রক্ষা পাবে, না হয় নগরপ্রাচীরের নীচে আমার কবর হবে।’

সম্রাটের বার্তাটি পড়ে সুলতান মৃদু হেসে বললেন, ‘স্বীকার করি,  তোমার সাহস আছে। আচ্ছা, আমিও প্রতিজ্ঞা করলাম, কনস্টান্টিনোপলের আকাশে হেলালি ঝাণ্ডা ওড়বে, না হয় তার মাটিতে আমার কবর হবে।’

মোটকথা, আরো কিছু রক্তক্ষয় ছাড়া সুলতানের সামনে কোন উপায় থাকলো না।

সুলতান তাঁর ফৌজকে একএক করে পাঁচদিন সময় দিলেন বিশ্রামের জন্য। তারপর ২০শে জুমাদাল উলা সন্ধ্যায় ঘোষণা  করলেন, ইনশাআল্লাহ ফজরের পর হামলা শুরু হবে। খবর যেন বাইরে যেতে না পারে সেজন্য ঐ রাত্রে কোন একটি প্রাণীকেও শিবিরের বাইরে যেতে দেয়া হলো না।

পুরো ফৌজ রাত জেগে দু’আ যিকির ও ছালাত তেলাওয়াতে মশগুল ছিলো।

প্রিয় পাঠক, চলো এখানে তোমাকে ইতিহাসের পাতা থেকে একটি ঘটনা বলি, তাহলে তুমি বুঝতে পারবে, মুজাহিদের তলোয়ার যে বিজয় অর্জন করে তার ফায়ছালা আসলে কোথায় হয় এবং কীভাবে হয়! সর্বোপরি বুঝতে পারবে, কাকে বলে যুদ্ধ, আর কাকে বলে জিহাদ!

ইস্তাম্বুল বিজয়ের পূর্বরাত্রে সুলতান মুহাম্মদ আলফাতিহ-এর উৎকণ্ঠা যেমন ছিলো মুজাহিদীনের জানমালের জন্য তেমনি ছিলো দুশমনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য। বিজয়ের অবস্থানে দাঁড়িয়েও তিনি শেষ চেষ্টা করেছেন বিরাট ছাড় দিয়ে হলেও সন্ধি করার। কিন্তু দুশমন জানে শুধু যুদ্ধ করতে, রক্ত ঝরাতে; অশ্রু ও রক্তের দায় কত কঠিন তা তো তার জানা নেই। আগামীকাল সূর্যোদয়ের পর কী হবে? আর কত জানের নাযরানা পেশ করতে হবে ইস্তাম্বুলের জন্য? আর কত নারী বিধবা হবে? আর কত শিশু এতীম হবে? সম্ভবত এই অস্থিরতা থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যেই তিনি মুলাকাতের আরযি পাঠালেন যামানার শ্রেষ্ঠ ওলী শায়খ শামসুদ্দীন আক-এর খেদমতে, যিনি ছিলেন শৈশব থেকে সুলতানের শিক্ষক ও দীক্ষক, সুলতান যাকে ভয় করতেন, সমীহ করতেন, শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালোবাসতেন। শায়খ শামসুদ্দীন আক-এর কাছ থেকেই কিশোর মুহাম্মদ সর্বপ্রথম শুনেছিলেন কুসতুনতুনিয়া জয়ের সুসংবাদের হাদীছ। সুলতানকে তিনি এই চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-জযবার উপরই গড়ে তুলেছিলেন যে, তোমাকেই হতে হবে কুসতুনতুনিয়া জয়কারী সেই মহান আমীর।

সুলতানের ইচ্ছা চূড়ান্ত হামলার সময় শায়খ যেন তাঁর পাশে থাকেন। কিন্তু সুলতানের দূত শায়খের তাঁবুর সামনে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলেন। প্রহরী বললেন, কারো জন্য ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। শত হোক, তিনি হলেন উছমানী সালতানাতের মহান সুলতান। এটা তার কাছে মনে হলো অপমানজনক। তিনি নিজেই গেলেন এবং বাধাপ্রাপ্ত হলেন। প্রহরীর সাফ জবাব, এমনকি সুলতানের জন্যও ভিতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। সুলতানের ক্রোধ তখন চরমে পৌঁছলো। তিনি প্রহরীকে হটিয়ে খঞ্জর দ্বারা তাঁবুর পর্দা ফেড়ে ফেললেন এবং .. এবং অবাক বিস্ময়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। শায়খ শামছুদ্দীন আক তখন সিজদায়। মাথার পাগড়ী পড়ে আছে মাটিতে। সফেদ চুলগুলো আসমানি নূরে ঝলমল করছে। সিজদায় পড়ে শায়খ অঝোরে কাঁদছেন আর দু’আ করছেন। শায়খের কান্না দেখে সুলতানেরও চোখ ভিজে উঠলো। তিনি শুনলেন শায়খের কান্নাভেজা আওয়াযের সেই মুনাজাত, ‘হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ আমার বেটা, আমি তাকে বিজয়ের খোশখবর বলে দিয়েছি। হে আল্লাহ, তুমি বিজয় দান করে বান্দার লাজ রক্ষা করো।’

সুলতানের অবস্থা তখন এই যে, পারলে মাটির সঙ্গে মিশে যান, আবার আনন্দে আত্মহারা হন। তিনি অনুতপ্ত ও আনন্দিত হৃদয়ে  সেখান থেকে ফিরে এলেন। তিনি তখন একেবারে ভারমুক্ত ও নিশ্চিন্ত। আকাশের অদৃশ্য থেকে তিনি তখন বিজয়ের আলোকরেখা দেখে ফেলেছেন।

প্রিয় পাঠক, ইতিহাসের পাতায় আছে আরো অনেক কথা,

ফজরের ছালাত সুলতান নিজেই পড়ালেন। তারপর চূড়ান্ত হামলার হুকুম দিলেন।

হামলা হলো বিভিন্ন দিকে, তবে আসল জোর ছিলো সেন্ট রোমানূস-এর দরজাকে কেন্দ্র করে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের ভাষায়, ‘দুপুর পর্যন্ত যেন আগুন-খুনের খেলা হলো। হাজার হাজার লাশ আগুনে পুড়লো, আর খুনের দরিয়ায় ডুবলো। বাইজান্টাইন যোদ্ধারা এমন সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করলো যার উদাহরণ আমাদের ইতিহাসে কমই আছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, হওয়ার কথাও নয়। দুপুরের দিকে এমন প্রবল হামলা হলো যে, সব প্রতিরোধ ঢলের মুখে খড়ের মত ভেসে গেলো। কনস্টান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরে বাইজান্টাইন পতাকার স্থানে লাল হেলালী ঝাণ্ডা উড়তে দেখা গেলো।’


[1] পর্দায় যখন সুলতান বায়যিদের কুসতুনতুনিয়া অবরোধের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিলো, তখন পুরো হলঘর কাঁপিয়ে নেপথ্যের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ইয়লদরম শব্দটি বারবার এমনভাবে উচ্চারিত হচ্ছিলো যেন সত্যি সত্যি বজ্রের গর্জন!

[2] আমার তালিবে ইলম ভাইদের কাছে অনুরোধ, এ তথ্যটি পড়ার সময় এখানে তারা যেন একটু থামে, আর অন্তর দিয়ে আল্লাহর কাছে কিছু যেন চায়।

[3] আরবীতে বলে القرن الذهبي বাংলায় তরজমা হবে, সোনালী শিঙ। শাখাটি দেখতে যেহেতু শিঙ-এর মত লম্বা ও কিছুটা বাঁকানো, আর বিশেষ করে সকালের সোনালী রোদে ঝিকমিক করে, তাই এর নাম হয়ে গেছে গোল্ডেন হর্ন।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*