ইশরাক এবং চাশত দু’টি কি একই নামায?

By | Mon 25 Safar 1442AH || 12-Oct-2020AD
আমাদের এ অঞ্চলে দীনদার শ্রেণীর লোকেরা সাধারণত ইশরাক এবং চাশতের নামাযকে ভিন্ন ভিন্ন নামায হিসেবেই জানেন এবং এভাবেই তারা আমল করেন। আমিও বিষয়টি এভাবেই জানতাম। পরে কোন কোন হাদিস দেখে একটু সন্দেহে পড়ে গেলাম যে দু’টি কি দুই নামায না এক নামাযেরই দুই নাম। এরপর দেখলাম এ নিয়ে আলেমদের মতানৈক্য রয়েছে। কোন কোন ফকিহ ও মুহাদ্দিসের ভাষ্যমতে দু’টি একই নামায আবার কারো মতে দুই নামায। এরপর দেখলাম ইউটিউবে সমসামিয়ক অনেক আলেম বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছেন, দু’টি একই নামায। তখনই বিষয়টি তাহকিকের প্রয়োজন অনুভব হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর আমার কাছে মনে হয়েছে যে দু’টি এক নামায নয়; বরং দুই নামায হওয়াই বেশি দলিলসম্মত। এবিষয়েই আজ একটু লেখার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
এক.
اشراق
(ইশরাক) শব্দটি شرقت الشمس شروقا وشرقا
অর্থ সূর্য উদিত হওয়া এবং أشرقت الشمس اشراقا অর্থ আলোকিত হওয়া থেকে ব্যবহৃত হয়েছে। এ হিসেবে صلاة الاشراق (সালাতুল ইশরাক) অর্থ হয় সূর্য উদিত হওয়া/আলোকিত হওয়ার সময়ের নামায। অর্থাৎ সূর্য উদিত হওয়ার পর মাকরূহ ওয়াক্ত (প্রায় পনের/বিশ মিনিট পর) চলে যাওয়ার পর যে নামায পড়া হয়।
ضحى
(দুহা) সম্পর্কে অভিধান শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আস সিহাহ’ এ বলা হয়েছে-الضحى حين تشرق الشمس দুহা হচ্ছে, যখন সূর্য উদিত/আলোকিত হয়। তবে অভিধান শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আল মুহকাম’ এ এর সঙ্গা লিখেছেন এভাবে- هو من طلوع الشمس الى أن يرتفع النهار وتبيض جدا দুহা হচ্ছে, সূর্য উদিত হওয়া থেকে পুরোপুরি দিন প্রকাশ পাওয়া এবং সূর্য খুব আলোকিত হওয়া যাতে কোন ধরণের অন্ধকার নেই, সেই সময় পর্যন্ত।–তাজুল আরূস: 38/454
দুই.
উপরের আলোচনা থেকে বুঝা গেল শাব্দিক অর্থের বিবেচনায় উভয়টি কাছাকাছিই। তবে ফুকাহায়ে কেরামের পরিভাষায় যদিও সূর্য উদিত হওয়ার পর মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত পুরো সময়কেই ইশরাক বলা হয় কিন্তু ইশরাকের মূল সময় হচ্ছে সকালের মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পরপর যে সময় সেটিই। তেমনিভাবে যদিও ইশরাকের পুরো সময়কেই ضحى (দুহা) বলা হয় কিন্তু দুহার মূল এবং উত্তম সময় হচ্ছে যখন সূর্য খুবই আলোকিত হয় এবং সূর্যের তাপ খুব প্রখর হয়। এ থেকেই মোটামুটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে ইশরাক এবং চাশত দু’টি এক নামায নয়। তাছাড়া সালাতুল ইশরাক এবং সালাতুদ্দুহা যে ভিন্ন ভিন্ন দু’টি নামায সেটি এই দুই নামাযসংক্রান্ত হাদিসের উসলুব এবং এর ফযিলতের দিকে একটু গভীর দৃষ্টিতে থাকালেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এসংক্রান্ত হাদিসগুলো একটু দেখুন:
যেসকল হাদিসে ইশরাকের নামাযের কথা এসেছে এগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপ:
ক.
আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামাতে আদায় করে এরপর সূর্য উঠা পর্যন্ত নামাজের স্থানে বসে আল্লাহ তা’আলার যিকর করে, তারপর দুই রাক’আত নামায আদায় করে- তার জন্য একটি হজ্জ ও একটি উমরার সাওয়াব রয়েছে। আনাস রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পূর্ণ, পূর্ণ, পূর্ণ (হজ্জ ও উমরার সাওয়াব)।
-তিরমিযি, হাদিস 586 [হাদিসটি হাসান]
قَالَ الترمذي: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
হাদিসটি হযরত আবু উমামা রা. থেকেও নির্ভরযোগ্য সনদে তাবারানি, কাবির: 8/209 এ বর্ণিত হয়েছে।
قال المنذري في الترغيب: رقم حديث 675 والهيثمي في المجمع: 10: 133: اسنده جيد.
খ.
হযরত নুআইম ইবন হাম্মার রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেন, হে আদম সন্তান! তোমরা দিনের শুরুতে চার রাকাত সালাত আদায় করো, আমি তোমার জন্য দিনের শেষ পর্ন্ত যথেষ্ট হয়ে যাব। মুসনাদে আহমদ: 37/137; আবু দাউদ, হাদিস 1289; সহিহ ইবনে হিব্বান: 6/275 [হাদিসটি সহিহ]
হযরত আবু দারদা এবং আবু যার রা. থেকেও তিরমিযি, হাদিস 475 এ হাসান সনদে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
قَالَ الترمذي: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
যেসকল হাদিসে সালাতুদ্দুহা তথা চাশতের নামাযের কথা এসেছে সেগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপ:
ক.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমার বন্ধু (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিন দিন করে সওম পালন করা এবং দু’রাকাত সলাতুদ্দুহা পড়া এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর সালাত আদায় করা।-সহিহ বুখারি, হাদিস 1981; সহিহ মুসলিম, হাদিস 721; আবু দাউদ, হাদিস
খ.
হযরত আব যর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আদম সন্তানের শরীরের প্রতিটি অস্থি প্রতিদিন নিজের উপর সদাকাহ ওয়াজিব করে। সুবহাল্লাহ বলা সাদাকাহ, আলহামদু লিল্লাহ বলা সাদাকাহ, আল্লাহু আকবার বলা সাদাকাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা সাদাকাহ। সৎ কাজের আদেশ একটি সদাকাহ, অন্যায় হতে নিষেধ করা একটি সদাকাহ। আর চাশতের দু’রাকাত সলাত এসব কিছুর পরিপূরক হতে পারে। -সহিহ মুসলিম, হাদিস 720; আবু দাউদ, হাদিস 1285
গ.
হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চার রাকাত চাশতের নামায পড়তেন। আবার আল্লাহর মর্জি হলে তার বেশিও পড়তেন। -সহিহ মুসলিম, হাদিস 719; ইবনে মাজা, হাদিস 1381
ঘ.
উম্মু হানী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাক্কা বিজয়ের দিন আট রাকাত চাশতের সলাত আদায় করেছেন। তিনি প্রতি দু’ রাক’আতে সালাম ফিরিয়েছেন। -আবু দাউদ, হাদিস 1290; সহিহ মুসলিম, হাদিস 719
ঙ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, চাশতের নামাযের প্রতি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তিরাই যত্নশীল। আর এটি হচ্ছে, সালাতুল আওয়াবিন।-সহিহ ইবনে খুযাইমাহ: 2/228; মুসতাদরাকে হাকিম: 1/314
চ.
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি চাশতের বার রাকাত নামায পড়তে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে স্বর্ণের একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। -তিরমিযি, হাদিস 473; ইবনে মাজা, হাদিস 1380
ছ.
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. একদল লোককে (সূর্য উদিত হওয়ার মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পরপর) চাশতের নামায পড়তে দেখলেন। তখন তিনি বললেন, তারা কি জানে না যে (চাশতের) নামায অন্য সময়ে উত্তম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘‘আওয়াবিনের নামাযের সময় হচ্ছে, যখন সূর্যের তাপ খুব প্রখর হয়’’-সহিহ মুসলিম, হাদিস 748; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ: 2/229; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস 2539
যায়েদ ইবনে আরকাম রা. এর উপরিউক্ত বর্ণনায় দু’টি বিষয় পাওয়া গেল:
ক. সালাতুদ্দুহা তথা চাশতের নামায হচ্ছে, সালাতুল আওয়াবিন।
খ. চাশতের নামায যদিও সূর্য উদিহ হওয়ার পর মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর থেকেই পড়া যায় তথাপি চাশতের নামাযের উত্তম ওয়াক্ত হচ্ছে, যখন সূর্যের তাপ খুব প্রখর হয়।
তিন.
উপরিউক্ত হাদিসগুলোতে আমরা দেখলাম সালাতুদ্দুহার উত্তম সময় হচ্ছে যখন সূর্য খুবই আলোকিত হয় এবং সূর্যের উত্তাপ খুব বেশি হয়। এর বিপরিত প্রথম ভাগের হাদিসগুলোতে যে নামাযের কথা বলা হয়েছে বলা হয়েছে সেটি আদায় করতে হয় দিনের এরেকবারে শুরুর দিকে। অর্থাৎ সূর্য উদিত হওয়ার পর যখন মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাবে তখনই এই নামাযটি আদায় করবে।
হাদিসগুলোতে আমরা আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ করলাম- দুই নামাযের হাদিসগুলোর উসলুন এবং ফযিলতও এক নয়। যেমন সালাতুল ইশরাক সংক্রান্ত হাদিসে এসেছে ফজরের নামাযের পর নামাযের স্থানে (মসজিদে) বসে যিকির আযকারে মগ্ন থেকে অপেক্ষা করবে। (অবশ্য মসজিদ থেকে বাহির হয়েও যদি যিকির আযকারে মগ্ন থাকে তবুও সালাতুল ইশরাকের সওয়াব পাবে) এরপর সূর্য উদিত হওয়ার পর (মাকরূহ ওয়াক্তের পর) দু’রাকাত নামায আদায় করবে। আর এর ফযিলতে বলা হয়েছে, এই দু’রাকাতের কারণে এক হজ্জ এবং এক উমরার সওয়াব পাবে। আর দিনের শুরুর দিকে ইশরাকের চার রাকাত পড়লে আল্লাহ তাআলা দিনের শেষ পর্ন্ত যথেষ্ট হয়ে যাবেন (অর্থাৎ দুনিয়া আখেরাতের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবেন)
এর বিপরিত সালাতুদ্দুহার হাদিসে ফজরের নামাযের পর নামাযের স্থানে (মসজিদে) বসে অপেক্ষা করার কথা নেই। আর এর ফযিলতে বলা হয়েছে: ক. সাদাকার সওয়াব পাবে। খ. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নামাযের ওসিয়ত করেছেন। গ. এটি হচ্ছে, ‘আওয়াব’ তথা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তকারীদের নামায। ঘ. যে ব্যক্তি সালাতুদ্দুহা বার রাকাত আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মান করবেন।
সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে ইশরাক এবং চাশত দু’টি এক নামায নয়। ইবনুল মুলাক্কান রহ. তাঁর তিরমিযি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, দিনের শুরুতে দু’টি নামায প্রসিদ্ধ। প্রথমটি হচ্ছে, সূর্য উদিত হওয়ার পর যখন এক বর্শা কিংবা দুই বর্শা পরিমান উপরে উঠে যায়। এই নামাযকে সালাতুল ইশরাক বলা হয়। আর দ্বিতীয় নামায হচ্ছে, যখন সূর্য দিনের এক চতুর্থাংশ পরিমান উপরে উঠে যায় সেই সময় থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত । এটাকে সালাতুদ্দুহা বলা হয়। আর অনেক হাদিসে সালাতুদ্দুহা নামাটি উভয় নামাযের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়েছে। -দেখুন, এ‘লাউস সুনান: 7/30
ইবনুল মুলাক্কানের বক্তব্যের শেষ অংশ থেকে আরেকটি সংশয়ও দূর হয়ে গেল। সেটি হচ্ছে, যে হাদিসগুলোকে আমরা ইশরাকের নামাযের দলিল হিসেবে পেশ করছি সেই হাদিসেরই অন্য রেওয়ায়েতে এই নামাযকে সালাতুদ্দুহা তথা চাশতের নামায বলা হয়েছে। এর জবাবে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ইশরাক ও চাশত উভয়টি আদায়ের মূল সময় যেহেতু এক (যদিও উভয়টি আদায়ের উত্তম সময় ভিন্ন ভিন্ন) অর্থাৎ সূর্য উদিত হওয়ার পর মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত পুরো সময়েই ইশরাক ও চাশত পড়া যায় তাই ইশরাকের নামাযের ক্ষেত্রেও সালাতুদ্দুহা শব্দটি প্রয়োগ হয়েছে।
তাছাড়া যে রেওয়ায়েতগুলো সালাতুল ইশরাককে সালাতুদ্দুহা বলা হয়েছে এগুলোর সুনদও দুর্বল।
ইশরাকের ক্ষেত্রে হাদিসে সালাতুদ্দুহা প্রয়োগ হওয়ার কারণেই অনেকে দু’টিকে এক নামায বলেছেন। আশাকরি উপরিউক্ত আলোচনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে সালাতুল ইশরাক এবং সালাতুদ্দুহা ভিন্ন ভিন্ন দু’টি নামায।
চার.
হযরত আলী রা. এর হাদিসে তো বিষয়টি এতোটাই সুস্পষ্ট যে এরপর আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না। হযরত আলি রা. এর হাদিসটি একটু লক্ষ করুন:
তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের সালাত পড়ার পর কিছুক্ষণ অবসর থাকতেন। এরপর সূর্য আসরের সময় পশ্চিমাকাশে যত উপরে থাকে, পূর্বাকাশে ঠিক ততটা উপরে উঠলে তিনি দু’ রাকআত সালাত আদায় করতেন, অতঃপর অবসর থাকতেন। অবশেষে পশ্চিম আকাশে সূর্য যতটা উপরে থাকলে যোহরের সলাতের ওয়াক্ত থাকে, পূর্বাকাশে সূর্য ঠিক ততখানি উপরে উঠলে তিনি চার রাকআত সালাত আদায় করতো। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার পর তিনি যোহরের (ফরয) সলাতের পূর্বে চার রাকআত এবং পরে দু’ রাকআত পড়তেন…।-মুসনাদে আহমদ: 2/79; তিরমিযি, হাদিস 598; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস 1161; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ: 2/218, 2/233 [হাদিসটি সহিহ]
قال الترمذي: هذا حديث حسن.
আল্লামা আব্দুল গনি রহ. তাঁর রচিত ইবনে মাজার শরাহ ‘ইজাহুল হাজাহ’ গ্রন্থে (1161) হাদিসটির ব্যাখ্যায় লেখেন-
‘‘হাদিসের সারমর্ম হচ্ছে, সূর্য আসরের সময় পশ্চিমাকাশে যত উপরে থাকে, পূর্বাকাশে ঠিক ততটা উপরে উঠলে তিনি দু’রাকআত সালাত আদায় করতেন, এটি হচ্ছে, الضحوة الصغرى তথা ছোট দুহার সময় আর এটি হচ্ছে, ইশরাকের ওয়াক্ত। আর এটিই ইশরাকের মধ্যম এবং সর্বোচ্চ ওয়াক্ত। বাকি ইশরাকের ওয়াক্ত প্রবেশ করে সূর্য উদিত হওয়ার পর যখন এক বর্শা কিংবা দুই বর্শা পরিমান উপরে উঠে যায়; যখন সূর্য প্রকাশ হয়ে যায় এবং মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত এই নামায দু’রাকাত পড়তেন আবার চার রাকাত পড়ার আদেশও করেছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘‘হে আদম সন্তান! দিনের শুরুতে চার রাকাত সালাত আদায় কর, আমি তোমার জন্য দিনের শেষ পর্ন্ত যথেষ্ট হয়ে যাব।
আর দ্বিতীয় যে সময়ে নামায আদায় করতেন সেটি হচ্ছে الضحوة الكبرى তথা বড় দুহার সময়। নবীজী কখনো এই সময়ে নামায পড়তেন আবার কখনো পড়তেন না। অন্য হাদিসে এর ওয়াক্ত বর্ণিত হয়েছে যখন সূর্যের তাপ খুব প্রখর হয়। আর এই সময়টি হচ্ছে, আনুমানিক দ্বিপ্রহরের ঘন্টা খানেক পূর্বে। আর এটি হচ্ছে, চাশতের সর্ব নিম্ন রাকাত। কখনো নবীজী চাশতের আট রাকাত পড়তেন আবার কখনো বার রাকাত পড়তেন।’’
পাঁচ.
আপনি সালাতুল ইশরাককে আলাদা নামায মানেন আর নাই মানেন, একথা তো প্রমাণিত যে নবীজী দ্বিপ্রহরের আগে দু’টি সময়ে নামায আদায় করেছেন।
ক. ফজরের জামাতের পর মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর সর্ব নিম্ম দু’রাকাত
খ. যখন সূর্য আকাশের এক চতুর্থাংশ উপরে উঠে এবং সূর্যের তাপ যখন প্রখর হয় তখন সর্ব নিম্ন দু’/চার রাকাত পড়েছেন।
তাই আপনি সালাতুল ইশরাক আলাদা নামায বলুন আর নাই বলুন আপনিও প্রথমে দু’রাকাত অথবা চার রাকাত এরপর দ্বিতীয় সময়টিকে দু’রাকাত/চার রাকাত/ছয় রাকাত আট রাকাত সর্বোচ্চ বার রাকাত পড়তে পারেন।
ছয়.
আরেকটি বিষয় লক্ষ করুন, নফল নামাযের মধ্যে যেহেতু তাদাখুল তথা একটির মধ্যে অন্যটি অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি স্বীকৃত বিষয়। যেমন জোহরের নামাযের সময় মসজিদে গিয়ে বসার আগে চার রাকাত সুন্নত আদায় করলে তাহিয়্যাতুল মসজিদও আদায় হয়ে যায়। তেমনিভাবে আপনি চাইলে সকালের মাকরূহ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পর দু’রাকাত নামায ইশরাক এবং চাশত দু’টির নিয়তেই পড়তে পারেন। আশা করা যায় দু’টিই আদায় হয়ে যাবে এবং দু’টিরই ফযিলত অর্জিত হয়ে যাবে।
তবে উত্তম হবে উভয়টি আলাদ আলাদাভাবে আদায় করা। অর্থাৎ সকালের মাকরূহ ওয়া ওয়াক্ত চলে যাওয়ার দু’রাকাত অথবা চার রাকাত আদায় করবেন এরপর চাশতের উত্তম সময়ে দু’রাকাত/চার রাকাত/ছয় রাকাত/আট রাকাত মোটকথা যতটুকু সম্ভব আদায় করতে পারেন। অবশ্য ইশরাকের পরপরই চাশতের নামায আদায় করলে আদায় হবে। তবে ভাল হয় মাকরূহ ওয়া ওয়াক্ত চলে যাওয়ার চার রাকাত এবং পরে সূর্যের তাপ যখন প্রখর হয় তখন চাশতের উদ্দেশ্যে আট রাকাত আদায় করবেন। এতে ইশরাক এবং চাশতের সকল ফযিলত (তথা ক. সাদাকার সওয়াব পাওয়া খ. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নামাযের ওসিয়তের উপর আমল গ. ‘আওয়াব’ তথা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঘ. হজ্জ এবং উমরার সওয়াব পাওয়া ঙ. সকল গোনাহ মাফ হয়ে যাওয়া এমনকি তা যদি হয় সমুদ্রের ফেনা পরিমাণও চ. পুরো দিনের জন্য চার রাকাত নামায যথেষ্ট হয়ে যাওয়া ছ. জান্নাতে স্বর্ণের একটি প্রাসাদ নির্মান।) পেয়ে যাবেন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন, আমিন।
Courtesy : মাওলানা মাহবুবুল হাসান আরিফী (Mahbubul Hasan Arife)
Post Link:  Facebook Link
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*